প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে মরা নদীতে পরিনত হয়েছে। নদীর বুকে জেগে ঊঠেছে বড় বড় চর। সেই সাথে পদ্মা সংযুক্ত প্রধান প্রধান শাখা প্রশাখাসহ অন্তত ৮৫টি নদী প্রায় পানি শুন্য হয়ে পড়েছে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্ত্রাঞ্চলের শিল্প, ব্যবসা-বানিজ্য, জীববৈচিত্র্য ও কৃষি খাত হুমকীর মুখে পড়েছে।
উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ দেখছেন, নদী শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। পদ্মা নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এর প্রধান শাখা নদী বড়াল, আত্রাই ও গড়াই নদী প্রায় পানি শুন্য হয়ে পড়েছে। কুষ্টিয়ার কয়ায় গড়াই নদীর উপর নির্মিত গড়াই রেল ও রুমী ব্রিজের নিচে ধু ধু বালু চর। জিকে প্রজেক্ট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পদ্মা, মধুমতি, নবগঙ্গা, কাজলা, মাথাবাঙ্গা, গড়াই, আত্রাই, চিকনাই, হিনসা, কুমার, সাগরখালি, কপোতাক্ষ, চন্দনাসহ পদ্মার ৮৫টি শাখা-প্রশাখা নদীর বুকে জেগে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য চর। কোন কোন স্থানে বালু স্থায়ী মৃত্তিকায় রুপ নেয়ায় ফসল আবাদ করেছেন অনেকেই। বর্তমানে পদ্মা নদী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ ব্রীজের নিচে খাস জমিতে কৃষক চিনা বাদাম, বাঙ্গী, তরমুজ, টমেটো, আখসহ নানা রকম রবি শস্য আবাদ করেছেন।
পদ্মার প্রধান শাখা নদী হলো মাথাভাঙ্গা, কুমার, ইছামতি, গড়াই, আড়িয়ালখা প্রভৃতি। প্রশাখা হলো মধুমতি, পশুর, কপোতাক্ষ। উপনদী একটি মহানন্দা। মহানন্দা রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানায় পদ্মায় মিলিত হয়েছে। পদ্মার পানি দিয়ে শুকনো মওসুমে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় সেচকাজ চালানো হয়। এ নদীর পানি দিয়ে প্রায় ২০ ভাগ জমির সেচকাজ চলে। বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বানিজ্য, নৌযোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদ্মা নদীর ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ফরাক্কা ব্যারেজের ভাটিতে মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরে আরো একটি ব্যারেজ তৈরি করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লকগেট, বাঁধ ও ফিডার ক্যানেল। ফিডার ক্যানেল লম্বায় ৩৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার। ফারাক্কা বাঁধ থেকে গঙ্গার পানি এই ক্যানেল পথেই ভাগীরথীতে পৌছে দেয়া হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ফিডার ক্যানেলে দৈনিক ৪০ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হয়। এক মজা নদীকে জীবন দিতে গিয়ে পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যতগুলো বৃহত্তম বাঁধ তৈরি করা হয়েছে ফারাক্কা বাঁধ তার মধ্যে অন্যতম।
আন্তর্জাতিক নদী পদ্মা (গঙ্গা) উজানে ভারত বাঁধ দিয়েছে। ফারাক্কা ব্যারেজ দিয়ে ভাগিরথী নদীর মাধ্যমে পানির প্রবাহ ঘুরিয়ে নিয়েছে। ফারাক্কার উজানে পানি থৈই থৈই করছে। ভাটির বাংলাদেশে ক্রমেই তীব্র পানি সঙ্কটে নিপতিত হচ্ছে। প্রমত্তা পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত প্রধান শাখা আত্রাই, গড়াইসহ ৮৫টি নদ-নদীতে পানির টান পড়েছে। এর সুদুর প্রসারি প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। সেই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে আর্সেনিকের মাত্রা।


ভারত ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ রাজ্যেও কানপুর ব্যারেজ এবং উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য আরো প্রায় ৪০০ পয়েন্ট দিয়ে পানি সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুস্ক মওসুমে এসব পয়েন্ট থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হয়ে থাকে। এর প্রভাবে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যায়। পদ্মা সংযুক্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত মহানন্দা, আত্রাই, বারনই, শিব, রানী ও ছোট যমুনাসহ ১২টি নদী ও ২০টি খালে এর প্রভাব পড়েছে। এসব নদী-খাল পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন মৃতপ্রায়। ফলে এ অঞ্চলের কৃষির সেচ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর হয়ে পড়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, শুধুমাত্র ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প-কারখানা সবকিছুতে মারাত্মক ক্ষতি করেছে। মিঠাপানি ছাড়া কৃষি তথা কোন ধরনের শিল্প-কারখানা চলতে পারে না। ফারাক্কার কারনে যশোর-খুলনা অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেছে। ফারাক্কার কারনে পদ্মার তলদেশ ওপরে উঠে এসেছে। শুস্ক মওসুমে এখন পদ্মায় তেমন ইলিশ পাওয়া যায় না। মাছ আসার জন্য পানিতে যে পরিমান প্রবাহ থাকার কথা সেটি না থাকায় এখন আর পদ্মায় ইলিশ আসে না। গাঙ্গেয় পানি ব্যবস্থায় দুইশতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ি ছিল। সেগুলোর অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে। পদ্মা নদীতে পানি স্বল্পতার কারণে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে মরুকরণ অবস্থা স্থায়ী রুপ নিতে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হুমকীর মুখে পতিত হয়েছে অনেক আগেই।
সরেজমিন পাবনার মধ্য দিয়ে পদ্মার আর একটি শাখা নদী মরা পদ্মা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে মূল পদ্মা, গড়াই এবং পাবনার চাটমোহরের বড়াল, ছোট যমুনা, পূনভবা, আত্রাই, ইছামতি, গুমানী, গোমতী, ভদ্রবতী, গোহালা, নন্দকুজা, গাড়াদহ, কাকন, কাকেশ্বরী, সরস্বতী, মুক্তাহার ঝবঝবিয়া, ফুলজোর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। পদ্মা নদীতে পানির প্রবল টান পড়ায় এই সব নদী শুকিয়ে গেছে। কোন কোন স্থানে হাটু পর্যন্ত পানি আছে। এলাকার প্রবীণ লোকদের মতে, ফারাক্কা ব্যারেজের আগে এই সব নদ-নদীতে সারা বছর পানি থাকতো। অপর দিকে তিস্তা নদীতে পানি না থাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে পানির টান পড়ায় যমুনা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। পাবনার নগরবাড়ী, বেড়া-নাকালিয়া যমুনা নদীর বুক জুড়ে অসংখ্য চর। বেড়ার নিকটবর্তী শাহজাদপুরে বাঘাবাড়ি ব্রিজের নিচে বড়াল নদীতে চর পড়েছে। যমুনা নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় রাসায়নিক সারবাহী ও পণ্যবাহী জাহাজ অর্ধেক লোড নিয়ে বাঘাবাড়ী বন্দরে ভিড়ছে।
হুগলিতে প্রবাহ আনতে গিয়ে পদ্মাকে রুগ্ন করা হয়েছে। যশোর-কুষ্টিয়ার নদীগুলো পদ্মার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে। পাবনার ইছামতি, রতœাই, চন্দ্রাবতী এবং রাজশাহী ও নাটোরের কয়েকটি নদী রয়েছে। পদ্মার প্রধান শাখা নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে মধুমতী, আড়িয়াল খাঁ, ভৈরব, মাথা ভাঙ্গা, কুমার, কপোতাক্ষ, পশুর ও বড়াল। নদী কিশেষজ্ঞরা বলেন, পানি প্রবাহের মাত্রা ৪০ হাজার কিউসেক হলে নদীতে আর পলি জমতে পারে না। তলদেশও ভরাট হয় না। প্রবাহ কম বলে পদ্মার বুকে মাইলের পর মাইল চর জেগে উঠছে।
বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গা নদীর পানি বন্টন চুক্তি ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার পর পানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌছে যায়। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবে গৌড়া নতুন দিল্লির হায়দারাবাদ হাউজে গঙ্গা নদীর পানি বন্টন সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ৩০ বছর দীর্ঘ মেয়াদী এই চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে শুষ্ক সময়ে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। কিন্তু বাংলাদেশ কোন বছরই চুক্তির শর্ত অনুয়ায়ী পানি পাচ্ছে না।
ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেক এর কম দেখা গেলে দুই দেশের সরকার তাৎক্ষনিক ভাবে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করে সমন্বয় সাধন করতে পারবে বলা হলেও কার্যত কিছুই হচ্ছে না। ভারত তার দাদাগিরি মনোভাব বজায় রেখেছে। অনুচ্ছেদ-২ এ বলা হয়েছে উভয় পক্ষ থেকে সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করবে। এই কমিটি ফারাক্কা পয়েন্ট হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকা ও ফিডার ক্যানেল এলাকায় পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি টিম নিয়োগ করবে। এই টিম উভয় সরকারের কাছে পানি প্রবাহের সংগৃহিত ডাটা-উপাত্ত পেশ করবে। তা যদি করত তাহলে পদ্মায় পানি প্রবাহ থাকত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নদী বিশেষজ্ঞ কামরুন নেছা জানান, বাংলাদেশের পদ্মার যে বিপুল আয়তন তাতে স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টির কথা উঠতো না। কিন্তু ভারত নেপালের কোশি থেকে শুরু করে ফারাক্কা পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথে পানি প্রত্যাহারের যে একতফা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে- তাতে বাংলাদেশের বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. সারোয়ার জাহান জানান, উজানে ভারতের নদী কেন্দ্রিক পরিকল্পনার কারণে পলি পড়ে পদ্মা নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আর এর প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিনাঞ্চলে পদ্মা সংযুক্ত প্রায় ৮৫টি নদী পানি শুন্য হয়ে পড়েছে। পানির এই সঙ্কট কাটাতে নদীগুলো খননের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও রাজবাড়ীর পাংশায় গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের বিকল্প নেই বলে তিনি জানিয়েছেন।

source: The Daily Naya Diganta