গত দুই দিন ধরে ’ভ্রান্ত ধারণা ও বাস্তব’ অবস্থা শিরোনামে এস আলম কর্তৃপক্ষের  একটি বিজ্ঞাপন চট্টগ্রামের স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রায় অর্ধেক পাতা জুড়ে প্রচারিত হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে বাঁশখালী উপজেলার গন্ডামারায় এস আলম গ্রুপের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্ল্যেখ করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদ সম্পর্কে এস আলম গ্রপের একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। ৪ এপ্রিলের বাঁশখালী হত্যাকান্ডে এস আলম গ্রুপের ভ’মিকা আড়াল করতে ও কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটিকে একটি পরিবেশ বান্ধব প্রকল্প হিসেবে হাজির করতে বিজ্ঞাপনটিতে যথেচ্ছ মিথ্যাচার করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনটি দেখা যাবে এখান থেকে

 

আমাদের  পক্ষে পত্রিকায় এস আলম গ্রুপের মতো কোটি টাকা খরচ করে পত্রিকায় রঙিন বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে তার পাল্টা জবাব দেয়া সম্ভব নয়। তাই ফেসবুক/অনলাইন এর উপর ভরসা রেখে এখানে এস আলম গ্রুপের মিথ্যা ও প্রতারণাপূর্ণ বক্তব্যের জবাব দেয়া হলো।

১. কৃষিজমি, লবণমাঠ, বসতভিটা ও কবর স্থানে প্রকল্প করার অভিযোগ সম্পর্কে এস আলম গ্রুপের বক্তব্য হলো: “প্রকল্প এলাকায় একফসলি জমি(লবণ চাষ করা হয়) ও স্বল্প ভূমিতে ৩৭টি মাটির ঘরের জন্য ১৫০টি পাকা ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। যাতে ওইসব পরিবারের ভবিষ্যত প্রজন্ম বসবাস করতে পারে। প্রকল্প এলাকায় কোন কবরস্থান থাকার তথ্যটিও সত্য নয়।”

 প্রথমত, শুধু মাত্র লবণ চাষের জমিতে প্রকল্প করার দাবীটি পুরোপুরি মিথ্যা। আমি নিজেই দেখেছি লবণমাঠের জমির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ধানী জমিতে এস আলম গ্রুপের খুঁটি লাগানো যা নীচের ছবিগুলো থেকেও স্পষ্ট হবে:

  দ্বিতীয়ত, এলাকাবাসী আমাদেরকে জানিয়েছেন ছোট বড় মিলিয়ে প্রকল্প এলাকায় বহু সংখ্যক কবরস্থান রয়েছে। শুধু কবরস্থানই নয়, বসত ভিটা, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল সহ বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

তৃতীয়ত, আমরা মনে করি প্রকল্প এলাকায় কয়টি বসত ভিটা আছে না আছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকল্প এলাকার চারাপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।

মাত্র ১৫০ পরিবারের বসতির কথা বলে অনুমোদন নেয়া হলেও গোটা এলাকায় প্রায় ৭ হাজার পরিবার বসবাস করে। প্রতি বর্গকিমি এ ১১৪৪ জনের বেশি মানুষ থাকে(বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো, ২০১২) এরকম একটি সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক জনপদে ১৩২০ মেগাওয়াটের বৃহৎ আকৃতির একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, ছাই দূষণ, শব্দ দূষণ স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে- বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সরাসরি উচ্ছেদ না হলেও আশপাশে বসবাসকারীরা দূষণের কারণে উচ্ছেদ হয়ে যাবেন। কাজেই এই রকম ঘনবসতি পূর্ণ এলাকার ঠিক পাশেই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

২. পরিবেশ ও জীব বৈচিত্রের উপর ধ্বংসাত্বক প্রভাব সম্পর্কে এস আলম গ্রুপ লিখেছে: “নিয়োগ করা আন্তর্জাতিক পরিবেশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বলেছে, ভূগর্ভের পানি, গাছপালা এবং বায়ু মন্ডলের উপর কোন বিরূপ প্রভাব পড়ার কোন সম্ভবনা নেই।”

প্রথমত, কোন আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এ ধরণের কথা বলেছে সেটা এস আলম গ্রুপ বিজ্ঞাপনে উল্ল্যেখ করেনি। কোন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প করতে হলে পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ করতে হয়, সেই ইআইএ সবার মতামতের জন্য উন্মুক্ত করতে হয়, গণশুনানি করতে হয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হয়। এস আলম গ্রুপ এসবের কিছুই করেনি। যে কাজ পরিবেশ সমীক্ষা করে নিশ্চিত করার কথা সে কাজ এস আলম এখন অর্ধপাতার বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে করতে চাইছে, এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারেন। কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কোন বিরূপ প্রভাব রাখবে না জাতীয় কথা কোন্ আন্তর্জাতিক পরমার্শক প্রতিষ্ঠান বলেছে আমরা তার নাম জানতে চাই।

দ্বিতীয়ত, ‘ভূগর্ভের পানি, গাছপালা এবং বায়ু মন্ডলের উপর কোন বিরূপ প্রভাব পড়বে না’ জাতীয় কথা বলে স্থানীয় জনগণকে আশ্বস্ত করা যাবে না। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলো কি কি ক্ষতি হতে পারে, এ ব্যাপারে স্থানীয় জনগণের ধারণা খুবই পরিস্কার। অনেকেই মনে করতে পারেন বাঁশখালীর মতো একটি এলকার মানুষ এসব আর কতটুকু বুঝবে, নিশ্চয়ই তাদেরকে উস্কানি দেয়া হয়েছে, ভুল ভাল বোঝানা হয়েছে। আমি তাদেরকে বলব দয়া করে একবার স্থানীয় লবণচাষী, চিংড়ি চাষী, জেলে, গৃহস্থ নারী পুরুষদের সাথে কথা বলে দেখুন, তাহলে বুঝতে পারবেন, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর দিকগুলো তারা কতটা ওয়াকিবহাল।

একটা উদাহরণ দেই, এক তরুণকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে কি ক্ষতি হবে?

বললেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনী থেকে নির্গত কালো ধোয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে যাবে, গাছপালা পরিবেশের ক্ষতি হবে, মানুষের ফুসফুসের নানান অসুখ বিসুখ হবে।

তাকে চ্যালেঞ্জ করে বললাম, আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন এগুলো ঘটবেই, আপনি কি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখেছেন?

জবাবে তিনি তার মোবাইল থেকে আমাকে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চিমনী থেকে বিপুল ধোয়া উৎগীরণ হচ্ছে এরকম একটি ভিডিও দেখালেন।

শুধু এই তরুণই নয়, আমি বহু মানুষের সাথে কথা বলেছি, তারা সবাই কমবেশি জানেন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে কি কি ক্ষতি হবে। গত কয়েক মাস ধরে স্থানীয় শিক্ষিত সচেতনদের উদ্যোগে রীতিমত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মতো করে প্রজেক্টর দিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিভিন্ন ভিডিও ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে দোকানে হাটে বাজারে মাহফিলে দেখানো হয়েছে। সেই সাথে জাতীয় কমিটির ওয়েবসাইট থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কিত পুস্তিকা, বুলেটিন, লেখালেখি ডাউন লোড করে পড়া, আলোচনা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে গোটা এলাকার জনগণের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে এক অভাবনীয় জাগরণ তৈরী হয়েছে।

আরেকটা উদাহরণ দেখেন, চিকন জাল দিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরেন এমন এক জেলে বলেছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত গরম পানি সমুদ্রের তীরবর্তী যে অঞ্চল থেকে তারা মাছ ধরে, সে অঞ্চলের মাছের ক্ষতি করবে, ফলে তারা আর আগের মতো মাছ পাবেন না।

উনার কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে একই ধরণের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব সম্পর্কে জাইকার একটা রিপোর্টের কথা। জাইকার রিপোর্টে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পক্ষে কথা বলা হলেও, স্বীকার করা হয়েছে, সমুদ্রের যে স্থানে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি নির্গত হবে, সে স্থানের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশি হবে, এমনকি ১.৩ কিমি দূরে পর্যন্ত ২ ডিগ্রী ও ১.৮ কিমি পর্যন্ত তাপমাত্রা ১ ডিগ্রী বেশি হবে, ফলে উক্তস্থানের মাছের ক্ষতি হবে।

 সূত্র:   Preparatory Survey on Chittagong Area Coal Fired Power Plant Development Project in Bangladesh

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিষাক্ত গ্যাস ও ফ্লাই অ্যাশের কারণে এলাকার ফসলের উৎপাদন কম হওয়ার আশংকাও তারা করেছেন।

খেয়াল করার বিষয়, এই আশংকাও অমূলক নয়। যেসব স্থানে কৃষি জমি ও লোকালয়ের পাশে একসময় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে মানুষের ফুসফুসের অসুখ বিসুখ যেমন বেড়েছে তেমনি ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যেমন: মহারাষ্ট্রের দাহানায় রিলায়ান্সের ৫০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সফেদার ফলন প্রায় ৬০ শতাংশ কমেগেছে। এই কমে যাওয়ার হার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিকটবর্তী স্থানেই বেশি। আগে যেখানে একর প্রতি সফেদা হতো ৯.২ টন এখন সেখানে একর প্রতি ফলন ৩.৭ টন।

 সূত্র: Impact of Coal-fired Thermal Power Plants on Agriculture; A case study of Chicku (Sapota) orchards of Dahanu, Maharashtra 

ছবি: শ্রীলংকার Norochcholai কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ছাই দূষণ

http://www.sundaytimes.lk/140622/news/monsoon-blows-foul-emissions-landward-covering-crops-houses-with-ash-104374.html

কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে এই মাত্রায় সচেতনতা তৈরী হয়েছে যেই জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বলেছে কোন ক্ষতি হবে না জাতীয় কথা বলে কি তাদেরকে ভোলানো যাবে!

৩. বিজ্ঞাপনে এস আলম গ্রুপ দাবী করেছে, “পরিবেশের ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য ভূগর্ভের পানি প্রকল্পে ব্যবহার হবে না, নলকূপও স্থাপন করতে হবে না।”

 উপকূলীয় অঞ্চলে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র জায়েজ করতে এটা বহুল ব্যবহ্নত একটি টেকনিক। ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার ক্ষেত্রেও এই ধরণের যুক্তি দেয়া হয়েছে। সাগরের পানি অসীম, তাই সাগরের পানি ব্যবহার করা হলে উপকূলের ভূগর্ভস্থ পানির কোন ক্ষতি হবে না- এটা অনেকেই মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন-

প্রথমত, বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার সময় সুমুদ্রের লবণ পানি ডিস্যালানাইজেশন বা লবণমুক্ত করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীতলী করণের কাজে ব্যবহার করা হবে এটা যদি ধরেও নিই, তারপরেও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কয়লা আমদানীল জন্য বন্দর নির্মাণ পর্যায়ে সমস্ত ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় স্বাদু পানির সংস্থানের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন করার প্রয়োজন হবে। গভীর নলকূপ থেকে পানি উঠানো হলে, সাগরের নোনা পানি ভূগর্ভে র পানি স্তুরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

দ্বিতীয়ত, বন্দরের জন্য নিয়মিত ড্রেজিং করার প্রয়োজন হয়। ড্রেজিং এর সময়ও সমুদ্রের লবণ পানি উপকূলের গ্রাউন্ড ওয়াটার সিস্টেমে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

এই বিপদ সম্পর্কে এলাকা বাসীর ধারণা পরিষ্কার। যেমন একজন লবণচাষী আমাকে বললেন, তারা বাড়ির টিউবওয়েল এর মাধ্যমে ১২০০ ফুট গভীর থেকে পানি উঠে। এখণ যদি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৩২০০ ফুট গভীর থেকে পানি তোলা শুরু হয়, তাহলে তার মতো বাড়ি ঘরের টিউবওয়েলে পানির সংকট হবে।

সমুদ্রের একেবারে তীরের জনপদ হলেও আশ্চর্যজনক ভাবে গন্ডামারার টিউবওয়েল থেকে যে পানি উঠে তা একেবারেই মিষ্টি পানি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে এই মিষ্টি পানির লবণাক্ত হয়ে যাওয়া ও পানির জন্য কোম্পানির সর্বরাহ করা পানির উপর নির্ভরশীলতা তৈরী হওয়ার আশংকার কথা জানালেন আরেকজন প্রবীণ লবণচাষী।

এখন প্রশ্ন হলো, গন্ডমারাবাসীর এই আশংকাগুলো কি একেবারেই অমূলক। বাস্তব উদাহরণ কি বলে? ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণপট্টম ও তামিল নারুর বিভিন্ন অঞ্চলের উপকূলীয় কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ঘুরে এসে শ্রীপদ ধর্মাধিকারি নামের একজন ভারতীয় বিশেষজ্ঞ “ব্রেকিং দ্যা মিথ বিহাইন্ড কোস্টাল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টস” শিরোনামে একটি লেখায় লিখেছেন-

“কৃষ্ণপট্টম অঞ্চলে যখন একের পর এক কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বন্দর নির্মিত হতে থাকল, তখন দেখা গেল এই অঞ্চলের র্র্ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমশ লবণাক্ত হতে থাকল। কয়েক বছরের মধ্যে এই পানি একেবারেই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেল। এখন গ্রামবাসীকে বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বরাহ করা ট্যাংকের পানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু এই পানি পান করার উপযুক্ত নয়, তাই অনেক পরিবারকে এখন বোতলের পানি কিনে খেতে হচ্ছে।”

ছবি: কৃষ্ণপট্টম গ্রামের প্রতিটি বাড়ির সামনে এখন প্লাস্টিকের ড্রাম রেখে দেয়া হয়, যেন ট্যাংকার থেকে সর্বরাহ করা পানি ধরে রাখা যায়।

তিনি আরো লিখেছেন- “কৃষ্ণপট্টম গ্রামের পার্শ¦বর্তী গুমাল ডিব্বা গ্রামে ভুগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততার পাশাপাশি মৎস চাষাবাদও নষ্ট হয়েছে। এই গ্রামের পরিবারগুলো কান্ডেলুরু ক্রিকে মাছ ধরতো। কৃষ্ণপট্টম বন্দর এই ক্রিকের মুখেই অবস্থিত।

বেশ কয়েকটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এখানে তরল বর্জ্য নির্গত হয় যার মধ্যে গরম পানিও রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, একদিকে বিদূৎ কেন্দ্র নির্গত তরল উষ্ণ বর্জ্যরে কারণে বিশেষত পোনা মাছ মারা যায় অন্যদিকে ড্রেজিং এর করণে ঘোলা পানি ও অন্যান্য বর্জ্যরে কারণে বড় মাছও মারা যায়। এই দুইয়ে মিলে তাদের মৎস চাষাবাদ প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

ফলে স্থানীয়রা এখন নিজেদের খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত মাছই পায় না, বাজারে বিক্রির জন্য পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া তো দূরের কথা। তাছাড়া জাহাজ আসা যাওয়ার কারণে মাছ ধরার নৌকা চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ ধরাও কঠিন হয়ে গেছে... ...

সেই সাথে কয়লার গুড়া ও ছাই এর সমস্যা তো আছেই- গ্রামের সর্বত্রই এমনকি পানির উৎসগুলোও এই দূষণে আক্রান্ত ।”

 সূত্র:Breaking the myth behind Coastal Thermal Power Plants

 এইসব জানার পরও কি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে বাঁশখালী বাসীর আশংকাগুলোকে এখনও অমূলক বা গুজব বলে মনে হয়?

৪. বর্গাচাষ করা জমি এলাকাবাসীর হাত ছাড়া হওয়া প্রসঙ্গে এস আলম গ্রুপ লিখেছে- ”যোগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেক পরিবার থেকে চাকরির সুযোগ দেয়া হবে।”

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রযুক্তি ঘন একটি স্থাপনায় যোগ্যতা অনুযায়ী এলাকাবাসী কি ধরণের কাজ পাবে সে বিষয়ে কিছু বলা না হলেও কর্মসংস্থানের পরিমাণ সম্পর্কে বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- “প্রথম ৫ বছরে প্রকল্পে কাজ করবে ৭ হাজার লোক। প্রকল্প নির্মাণ শেষে স্থায়ী কর্মসংস্থান হবে প্রত্যক্ষাবে ১ হাজার লোকের। পরোক্ষভাবে আরো ৫ হাজার লোকের।”

গন্ডমারার কয়েকজন বর্গাচাষীকে এই বিজ্ঞাপনটি পড়ে শোনানো হলে, তারা সকলেই বলেন, গন্ডামারায় লবণ, চিংড়ি, সামুদ্রিক মৎস, ও কৃষির মাধ্যমে ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়। এসব কর্মসংস্থান ধ্বংস করে ১ হাজার লোকের কর্মসংস্থান দিয়ে কি হবে?”

তাছাড়া পরিশ্রম হলেও বিদ্যমান কর্মসংস্থান নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এই এলাকা থেকে শ্রমিক অভিবাসনের পরিমাণও কম। তাছাড়াও প্রশ্ন হলো, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্থায়ী যেসব কর্মসংস্থান হবে সেখানে কি ধরণের কাজ পাবে কয়জন এলাকাবাসী? ভারতের অভিজ্ঞতা কি বলে? এ বিষয়ে কৃষ্ণপট্টম গ্রামের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে শ্রীপদ ধর্মাধিকারি লিখেছেন-

“শিক্ষিত না হওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের পক্ষে অন্য কোন ধরণের কাজ করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বন্দরে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে উন্নয়ণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও, খুব বেশি হলে যে কাজগুলো এলাকাবাসীল কপালে জোটে তা হলো স্ইুপার ও দারোয়ানের কাজ। এবং এগুলো স্থায়ী চাকুরি নয়, চুক্তি ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়।”

http://indiatogether.org/water-conc...

৫. হাজার হাজার মানুষের শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলিবর্ষণ সম্পর্কে এস আলম সংবাদ মাধ্যমের বরাত দিয়ে লিখেছে- “বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ নেয়া দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সমাবেশে সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে পুলিশের গাড়িবহরে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী পক্ষ বাধা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি ছোঁড়ে।”

বাঁশখালী গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে, মাটির ঘরে গুলির চিহ্ন ইত্যাদি দেখে এস আলম গ্রুপের এই বক্তব্যের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় নি। সংবাদ মাধ্যমগুলো প্রথম থেকেই এই ঘটনাকে তৃপক্ষীয় সংঘর্ষ হিসেবে হাজির করেছে। বাস্তবে তিন পক্ষের কোন অস্তিত্ব নেই। এখানে পক্ষ দুটি- এক পক্ষে রয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধী সাধারণ গ্রামবাসী ও অন্যপক্ষে রয়েছে এসআলম গ্রুপের ভাড়াটে মাস্তান, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাতের স্থানীয় অনেক নেতা যারা এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিরোধীরা আগের দিন নিরীহ মানুষদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে সমাবেশ ডেকেছিল। সেই সমাবেশ স্থল প্রকল্প এলাকা থেকে কয়েক কিমি দূরে। তাহলে পুলিশ কিংবা কয়লা বিদ্যুতের পক্ষের মাস্তানরা সেই সমাবেশ স্থলে গেল কেন? এরকম যদি হতো আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে প্রকল্প অফিসে হামলা চালাতে গিয়েছে তাহলে না হয় সংঘর্ষের একটা প্রশ্ন উঠতো। ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টিও অদ্ভুত- সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে আগের দিন। তাহলে পরের দিন সমাবেশ শুরুর আগমূহুর্তে যখন এলাকবাসী ইতোমধ্যেই সমাবেশ স্থলে চলে এসেছে- তখন তাড়াহুড়া করে ১৪৪ ধারা জারি করার কি অর্থ থাকতে পারে? হামলাকে সংঘর্ষ হিসেবে চালানো ছাড়া? তাছাড়া পুলিশ সমাবেশ স্থল থেকে বেশ দূরে কুলসুম বেগমের মাটির ঘরে ঢুকে পর্যন্ত তাকে গুলি করেছে। কুলসুম বেগম ও মরিয়ম বেগমের বুকে ও মুখে গুলি করার কি কারণ? তারা কি কারো উপরে হামলা করতে গিয়েছিলেন?

আসল ঘটনা হলো, কোন ভাবেই আন্দোলন মিছিল মিটিং দমণ করতে না পেরে, এস আলম গ্রুপ ভাড়াটে মাস্তান দের দিয়ে হামলা করে ভয়ভীতি সঞ্চার করতে চেয়ে ছিলো। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এস আলমের চিহ্নিত মাস্তানরা পুলিশ বা আনসারের পোশাক পড়ে গুলি করেছে, পুলিশও তাতে অংশ নিয়েছে। তারই ফলে প্রাণ গিয়েছে ৪ জন নিরীহ গ্রামবাসীর।

৬. ভারত ও চীনৈ কয়লা বিদ্যুতের ব্যবহারে উদাহরণ দিয়ে বিজ্ঞাপনে বলা হয়- “চীনে ৯০ আর ভারতে ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় কয়লা থেকে। আমেরিকা, জার্মানি ও জাপানের মতো উন্নত দেশেও এই ধরণের প্রকল্প চালু ও সচল রয়েছে। আমাদের পরিবেশের সাথে সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কয়লার ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে সর্বাধুনিক মেশিন আমদানি করা হবে।”

প্রথমত, বাংলাদেশের পরিবেশের সাথে সংগতি রেখে সর্বাধুনি কি মেশিন এস আলম গ্রুপ আমদানি করবে সেটা আমরা জানতে চাই। সেই মেশিনে কি কয়লা পোড়ানোর প্রয়োজন হবে না? সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড, বিষাক্ত ছাই, বর্জ্য পানি ইত্যাদি বের হবে না?

দ্বিতীয়ত, সন্দেহ নেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একসময় ব্যাপক আকারে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। কিন্ত বর্তমান কালে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণের ভয়াবহতা দিনে দিনে উন্মোচিত হওয়ার কারণে বর্তমানে ওইসব দেশের অনেকগুলোই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরে আসছে। পরিবেশের কঠোর বিধি বিধান মেনে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সর্বত্রই খুব কঠিন হয়ে উঠেছে, বাঁশখালীর মতো ঘনবসতি পূর্ণ জনপদে এরকম বড় আকারের কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের তো প্রশ্নই আসে না। উদাহরণ স্বরুপ চীনের কথা বলা যায়। চীনের বেইজিং এ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সৃষ্ট স্মগ বা ধোয়াশার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। একারণে সম্প্রতি বেইজিং এর সমস্ত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

Beijing, where pollution averaged more than twice China’s national standard last year, will close the last of its four major coal-fired power plants next year.

http://www.bloomberg.com/news/artic...

ভারতে নগর শহরের ২৫ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিরুৎসাহিত করা হয়। কিছু দিন আগে ভারতে মধ্যপ্রদেশে কৃষিজমি ও জনবসতির কাছে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করে দেয়া হয়।

Noting that a thermal power plant near human habitat and on agricultural land was not viable, a Central green panel has refused to give approval to the National Thermal Power Corporation (NTPC) to set up a 1320 MW coal-based project in Madhya Pradesh.

http://www.thehindu.com/news/national/ntpcs-coalbased-project-in-mp-turned-down/article819873.ece

সবশেষে বলতে চাই, বাঁশখালী র গন্ডামারাবাসীর সাথে কথা বলে ও এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমি নিশ্চিত যে ঐ এলাকায় আর কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সম্ভব নয়। এস আলম গ্রুপ যতই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিক, সরকারের মন্ত্রীর যতই হুমকী ধামকি দিক, দালালরা যতই গুজব নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াক- বাশঁখালী বাসীকে কোনভাবেই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প মেনে নিতে রাজী করানো যাবেনা। ইতোমধ্যে ক্রয়করা জায়গায় প্রথমে যেমন সুতার কারখানা বা জুতার কারখানা করার কথা বলেছিল এস আলম তেমন কিছু করলে অবশ্য এলাকাবাসী সাদরে তা মেনে নেবে, সহযোগীতাও করবে- এস আলম গ্রুপ, চাইনিজ কোম্পানি সেপকো ৩ ও এইচটিজি এবং বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করতে পারবে ততই মঙ্গল। বস্তুত, শুধু বাঁশখালীই নয়, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিভিত্তিক একটি দেশের কোথাও এত বড় আকারের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা উচিত নয় বলে আমি মনে করি। কোথাও জোর করে স্থাপন করতে পারলেও এক সময় না একসময় জনগণএর দূষণের শিকার হয়ে প্রতিরোধ তৈরী করবেই। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র না করে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ, প্রয়োজনে এলএনজি আমদানী করে হলেও, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমেই জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। তারপরেও যদি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতেই হয় তাহলেও সেটা করতে হবে একেবারেই ছোট আকারের, অনুর্ধ্ব ১০০ মেগাওয়াটের এবং সে ক্ষেত্রেও প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশের বিষয়টা মাথায় রেখে, জনগণেনর সম্মতি নিয়েই সেটা করতে হবে; জোর করে কোন অবস্থাতেই কোন ’উন্নয়ণ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে না।