গত ২৮ অক্টোবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর প্রদত্ত কয়েকটি তথ্য আমাকে কলামটি লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই ইউনিটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় হবে ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার, মানে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। ইউনিট দুটোর কাজ শেষ হতে সময় লাগবে নয় বছর। এই দুটো ইউনিট থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাক্কলিত নির্মাণব্যয় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের মধ্যে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে দেবে রাশিয়া, বাকি ১৫০ কোটি ডলার বাংলাদেশ ব্যয় করবে। রাশিয়ার ঋণের সুদের হার হবে ৪ শতাংশ, যা ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৮ বছরে বাংলাদেশকে সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার রোসাটম নামের যে প্রতিষ্ঠানটি এই প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছে, তারা প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে আনুমানিক ৬০ বছর আয়ু হবে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এক বছর রোসাটম প্ল্যান্টটি পরিচালনা করবে। খুবই উদ্বেগজনক হলো, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার যখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট প্রকল্প গ্রহণের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০০ কোটি ডলার থেকে ৪০০ কোটি ডলার।

ওপরের তথ্যগুলো অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে আমার কাছে মোটেও স্বস্তিদায়ক মনে হয়নি। আমি পরমাণুবিজ্ঞানী না হলেও প্রকল্প মূল্যায়নের (প্রজেক্ট ইভ্যালুয়েশন) উচ্চতর কোর্সগুলোর সঙ্গে পরিচিতির কারণে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণের মাপকাঠি সম্পর্কে অবহিত। সে জন্যই আমার আশঙ্কা হচ্ছে, যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে তার ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণ দেশের জন্য ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই এই প্রকল্প থেকে সুযোগ থাকলে এখনো বাংলাদেশের সরে আসা সমীচীন হবে।
বাংলাদেশের মতো একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পাবনার রূপপুরে, মানে দেশের মাঝখানে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নিরাপদ কি না, সেটি এমনিতেই একটি বিতর্কিত বিষয়। বাংলাদেশে ২০০৯-১০ সালে ওই ইস্যুকে ঘিরে পরমাণুবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তি বিশারদদের মধ্যে জমজমাট বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, যেগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে পড়লেও বিতর্কে অংশগ্রহণ করিনি অনধিকার চর্চা হবে ভেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী গত ৭০ বছরে সংঘটিত পারমাণবিক প্রকল্পের ভয়াবহ কয়েকটি দুর্ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইলস আইল্যান্ড, ইউক্রেনের চেরনোবিল ও জাপানের ফুকুশিমার খবর পত্রপত্রিকায় পড়েই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তাম এই ভেবে যে চেরনোবিল যদি ইউক্রেনের বিরল বসতি অঞ্চলে অবস্থিত না হয়ে বাংলাদেশের রূপপুরে অবস্থিত হতো, তাহলে ওই নিউক্লিয়ার মেল্টডাউনের ফলে চেরনোবিলের চারপাশের আনুমানিক ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের নানাবিধ ক্ষতির পরিবর্তে বাংলাদেশে নিঃসন্দেহে ক্ষতি হতো এর চেয়ে অনেক বেশি! (যেহেতু তেজস্ক্রিয়তার কারণে সৃষ্ট প্রাণঘাতী রোগগুলো সঙ্গে সঙ্গে হয় না, তাই মানুষের মৃত্যুসংখ্যা নিরূপণ কঠিন হয়।)
আমরা অনেকেই এখন ভুলে গেছি যে ওই মেল্টডাউনের ২৯ বছর পরেও চেরনোবিলের চারদিকের কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে এখনো মানব বসতির অযোগ্য ঘোষণা করে ওই এলাকাকে বিরানভূমি (ওয়েস্টল্যান্ড) করে রাখতে হয়েছে, প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি এখনো অতি বিপজ্জনক থাকায় ওই এলাকায় প্রটেক্টিভ আবরণ ছাড়া আজও কোনো মানবসন্তানের যাওয়া বিপজ্জনক। পারমাণবিক দুর্ঘটনা নিরোধের ব্যবস্থা যতই অত্যাধুনিক হোক না কেন, তা যে সুনামির মতো প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে প্রায় অকার্যকর প্রমাণিত হতে পারে, তার নজির সৃষ্টি হয়েছে জাপানের ফুকুশিমায়। ওই দুর্ঘটনা ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি করার আগেই তার অভিঘাতকে সীমিত করা গেছে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতির আশঙ্কা এখনো জাপানকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে।
বাংলাদেশের যমুনা নদীর তলদেশ দিয়ে ‘যমুনা ফল্ট’ নামের একটি ‘টেকটোনিক ফল্ট’ রয়েছে, তাই বাংলাদেশের মাঝামাঝি অঞ্চলকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে খোদ যমুনা নদীর জন্মই হয়েছে প্রায় ৪০০ বছর আগে সংঘটিত এ অঞ্চলের মহা-ভূমিকম্পের কারণে, যার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রধান প্রবাহ পুরোনো খাতের পরিবর্তে জামালপুর থেকে বর্তমান যমুনা নদীর খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। পুরোনো ধারাটি ÿক্ষীণকায় হয়ে জামালপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ভৈরবে এসে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। ওই ধরনের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হলে রূপপুর পারমাণবিক রি-অ্যাক্টরের যে ÿক্ষতি হবে না এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটাবে না, তার গ্যারান্টি কী? এই মহাপ্রলয়ের ঝুঁকি কেন নিচ্ছি আমরা? এত বিশাল বিপদের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সরকার কেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা বোঝা মুশকিল। অবশ্য, স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নই যে বিষয়টা বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও পরিবেশবিদের এখতিয়ারভুক্ত বিধায় আমার মতামতকে এ ক্ষেত্রে অপাঙ্ক্তেয় বিবেচনা করলে নীতিপ্রণেতাদের দোষ দেওয়া যাবে না।
কিন্তু আমার আপত্তি প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণে। প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই ৩০০–৪০০ কোটি ডলারের প্রকল্পকে যেভাবে ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের প্রকল্পে রূপান্তরিত করে ফেলা হলো, তাতে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ২,০০০ কোটি ডলারের ‘সাদা হাতি’-তে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। আর ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের যে প্রাক্কলিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হচ্ছে, তা-ও অর্জনযোগ্য না হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবে যদি বিষয়টা এ রকম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রূপপুরে বিদ্যুতের ইউনিট-প্রতি উৎপাদন খরচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যান্য বিকল্প প্রযুক্তির তুলনায় অনেক কম হবে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার ভিত্তি দুর্বল হতে বাধ্য। গত ২৯ অক্টোবর ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় একজন লেখক উল্লেখ করেছেন যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-প্রতি বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ নাকি মাত্র তিন টাকা কুড়ি পয়সা পড়বে। ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার প্রকল্প ব্যয় ধরে যে এই উৎপাদন খরচ হিসাব করা হয়নি, সেটা নিশ্চিত।
আমার অভিমত, এই মহাগুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হিসাবটা আবারও ভালোভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশের খ্যাতনামা স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। তাঁর বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, দক্ষতা এবং সততা প্রশ্নাতীত। তাই তাঁর ওপর আমাদের ভরসাও বেশি। কিন্তু আমার কেন জানি সন্দেহ হচ্ছে যে নয়-দশ বছরে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হচ্ছে, তা দেশের জন্য একটা ‘মহা-অপচয়’ হতে চলেছে, যা মহা-বিপর্যয়করও হতে পারে। আবার, প্রকল্পের শেষে গিয়ে যদি দেখা যায় যে প্রকল্পের প্রকৃত খরচ ২,০০০ কোটি ডলার বা ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাহলে তো ব্যাপারটা পুরো অর্থনীতির জন্য বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমরা হয়তো বেঁচে থাকব না, কিন্তু এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের সবাইকে অভিশাপ দেবে। কারণ, সুদাসলে ঋণটা তাদেরই পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে দুর্নীতির অজুহাতে হাত গুটিয়ে নিয়েছিল, তখন বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব যাঁরা দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে আমিও ছিলাম। অনেক দেশি-বিদেশি পণ্ডিত ও পরামর্শক ওই পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য দুঃসাহস আখ্যা দিয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের অবস্থানই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এবারও ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমার আশঙ্কাটি জাতিকে জানাচ্ছি, যদিও ইতিমধ্যে বেশ কিছু অর্থ রূপপুর প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য ব্যয় হয়ে গেছে, তবু এটুকু ক্ষতি স্বীকার করতে হলেও এই প্রকল্প থেকে বাংলাদেশের সরে আসাই সমীচীন হবে। পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনেক কম পড়ে, সেটা মোটামুটি আমাদের জানা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো জনাকীর্ণ দেশের জন্য এই প্রযুক্তি তেমন লাগসই (অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি) নয়, তা-ও বোঝা প্রয়োজন। আর, ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের এই বিশাল অর্থের অন্য কোনো অধিকতর উপযোগী ব্যবহারের ক্ষেত্র কি আমাদের নেই?
রূপপুরের প্রকল্প এলাকাটি পাকিস্তান আমলেই পরমাণু প্রকল্পের জন্য সরকার অধিগ্রহণ করেছিল, ৪৭ বছর ধরে সেটা খালি পড়ে রয়েছে। এত দিন আমাদের সামর্থ্য ছিল না এত বড় প্রকল্প গ্রহণের। এখন ইনশা আল্লাহ অর্থনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হওয়ায় আমরা এত বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সাহস পাচ্ছি। কিন্তু আমার বিবেচনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের চেয়ে আরও অনেক বেশি প্রয়োজনীয় একটি প্রকল্প আমাদের অগ্রাধিকার দাবি করছে। আমার মতে, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পটি দেশের জন্য অনেক বেশি গুরুত্ববহ, যেটা বহু বছর ধরে ঝুলে আছে অর্থায়ন করা যাচ্ছে না বিধায়। বিশেষত, ফারাক্কা বাঁধের বিপর্যয়কর অভিঘাতগুলো বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পুরো এলাকাকে যে ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, তা মোকাবিলা করার জন্য গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফারাক্কার পানি শুষ্ক মৌসুমে এতই অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়েছে যে ফারাক্কা বাঁধের ভাটিতে গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহ থেকে জন্ম নেওয়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে, যার ফলে ওগুলো ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে, ওগুলোর পানির লবণাক্ততা বাড়ছে এবং যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরায় বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করছে। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প এসব নেতিবাচক অভিঘাত নিরসন করবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস। ওই প্রকল্পে বেশ কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও সম্ভাবনা আছে। আর, রূপপুর প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গায় একটি বৃহদাকার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও গড়ে তোলা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি বিষয়গুলো আরেকবার ভেবে দেখবেন?
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো