বাংলাদেশে জলবায়ূ পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা, পরিবেশ সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক  নিয়ে গ্রীনবার্তা ডটকমের সম্পাদক ইমরান আনসারীর সাথে নিউ ইয়র্কে কথা বলেছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও ক্লাইমেট নেগোসিয়েটর কামরুল ইসলাম চৌধুরী। নিম্নে সাক্ষাতকারটি পূর্নাঙ্গ প্রকাশিত হলো।
আপনি কিভাবে পরিবেশ সাংবাদিকতায় জড়িত হন?
১৯৮২ সালের দিকে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শামস কিবরিয়া , পরিবেশ বিজ্ঞানী কে এম জালাল , সাংবাদিক এবিএম মুসা, বজলুর রহমান, আহম্মেদ নূরে আলমের প্রেরণায় পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়র সাংবাদিকতায় ঝুঁকে পড়ি।

বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরমা গঠনের শুরুর দিকের কিছু কথা যদি একটু বলতেন।

১৯৮৩ সালে জাতিসংঘ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ -এর তদানীন্তন নির্বাহী পরিচালক শামস কিবরিয়ায়, এবিএম মূসা এবং আহমেদ নূরে আলমের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম গঠিত হয়। 

পরিবেশ সাংবাদিকতা ফোরামের কার্যক্রম সম্পর্কে একটু বলবেন কি?
বাংলাদেশে পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম একসময়ে প্রতি বছর বাৎসরিক পরিবেশ চিত্র প্রকাশ করতো বাংলায় ও ইংরেজীতে। ইংরেজীতে ‍Annual statement of Environment Report যা সাংবাদিকরাই লিখতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন সাংবাদিক এনায়াতুল্লাহ খান, মাহফুজ আনাম, গাজীউর রহমান, শিহাব উদ্দিন আহম্মেদ, নূওে আলম, সৈয়দ কামাল উদ্দিন আহম্মেদ, তাহমিনা সাইদ, চন্দন সরকার, আনোয়ার হোসেন মঞ্জ, ফজলুল বারী, মাহমুদ শফি, শামিম চৌধুরী, কাজী শাহনাজ, মইনুদ্দীন নাসের প্রমূখ। বাৎসরিক এই পরিবেশ চিত্র দেশে বিদেশে সাড়া জাগায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম বেশ কিছু ‘আর্থ ফাইল’ তৈরী করে যা বিটিভিসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। দু:খজনক হল্ওে সত্য যে আর্থিক সংকটের কারণে গত কয়েক বছর ধওে বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের কার্যক্রম তেমন একটা নেই বললে চলে। যার ফলে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সাংবাদিকতা নানামূখি সংকটে পড়েছে। পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সাংবাদিকতা নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষন আয়োজন, ফিল্ড ভিজিট ও সরেজমিনে প্রতিবেদন প্রণয়ন ও কৌশল ইত্যাদির আয়োজনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সে কারণে তরুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা এই নতুন ধারার সাংবাদিকতা বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে বার্ষিক পরিবেশ চিত্র প্রকাশ।

 ৮০’র দশকে পরিবেশ বিষয়ক রিপোর্ট কে পত্রিকাগুলো কেমন গুরুত্ব দিত?

পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সাংবাদিকতায় কিছুটা স্পেস পাওয়া যেতো। তবে অনেক সময় ট্রীটমেন্ট ভাল পাওয়া যেতোনা।। কারণ তখনও টেকসই উন্নয়ন সাংবাদিকতার প্রচার ও প্রসার তেমন এটটা ঘটেনি। সংবাদপত্রে বা গণমাধ্যমে পরিবেশ সাংবাদিকতা ছিল তখনও নতুন এক দিগন্ত।

আপনি কিভাবে ‘ক্লাইমেট নেগোসিয়েটর’ হিসেবে আবির্ভূত হন ?

জলবায়ু পরির্তন সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নব্বই -এর দশকের গোড়াতে জলাবায়ু পরিবর্তন নেগোসিয়েশনে জড়িয়ে পড়ি। জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সনদ প্রণয়ন কর্মকান্ডে অংশ নেয়ার সুযোগ ঘটে। ফলে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন নেগোসিয়েশনের গোড়া থেকে বাংলাদেশ সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘ জলবায়ু সনদের অধীনে সকল দরকষাকষিতে অংশ নেয়ার সুযোগ ঘটে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ‘জলবায়ু কূটনীতির’ অন্দর মহলে উপস্থিতির বিরল সুযোগ ঘটে।

ফ্রান্সে অনুষ্ঠিতব্য কোপ -২১ এর ভবিষ্যত কি?

প্য্যারিসে আসছে জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে বাংলাদেশসহ সল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো কতটা এ্যম্বিশাস , ফেয়ার ও ব্যালান্স জলবায়ু চুক্তি করতে পারবে তা নিয়ে এখনও সংশয় কাটেনি। গ্রীনবার্তা ডটকমের সম্পাদক ইমরান আনসারীর সাথে নিউ ইয়র্কে কথা বলছেন বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও ক্লাইমেট নেগোসিয়েটর কামরুল ইসলাম চৌধুরী

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট ওবামা ও চীনের সাম্প্রতিক অঙ্গীকার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?
ওবামার জলবায়ু নিয়ে বক্তৃতা যতটা না চটকদার তার চেয়ে বেশী বাস্তবতা বিবর্জিত। অতীতেও এমন আসার বানী তিনি শুনিয়েছেন। কিন্তু তা বাস্তবতার মূখ দেখেনি। কিউটো চুক্তি অনুযায়ী কার্বণ নিঃসরণ মাত্রা কমানোর কথা থাকলেও আদতে তা বেড়েই চলেছে। আসন্ন প্যারিস চুক্তিতে কার্বন নিঃসরণ মাত্রার হ্রাস টানা যাবে কিনা তা নির্ভর করবে কার্বন পরাশক্তিগুলোর সদিচ্ছার উপর। উন্নত বলুন আর দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলো বলুন কেউই কার্বণ নিঃসরণ কমাতে রাজী হচ্ছে না।


বাংলাদেশে জলাবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার ধরণ ও মান নিয়ে যদি আপনার দৃষ্টি ভঙ্গি জানাতেন।
আমাদের দেশে এখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বড় আকারের গবেষণা হচ্ছে না। দু’চারটি বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাতেগোনা কয়েকটি চটজলদি লোক গবেষণা কর্ম চালালেও মোটা দাগে কোনো ধ্রুপদি গবেষণা এখনো পর্যন্ত হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রমে জলাবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে মৌলিক গবেষণায় আরো ব্যাপক জোড় দিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশ আরো কি কি পদক্ষেপ নিতে পারে?
বাাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ‘ফ্রন্ট লাইন’ দেশ । সে কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অতি অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহন করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ‘জলবায়ু কূটনীতি’ জোরদার করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন হবে নতুন প্রজন্মের একদল জলবায়ূ কূটনীতিক তৈরী করা । পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন নেগোসিয়েশনে অভিজ্ঞ ব্যাক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি পেশাদার প্রশিক্ষক টীম গঠন করা যেতে পারে।