দুপুর সাড়ে ১২টা। ভোরের আগেই যে মাঝারি বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, তখনো তা ঝরছে ইলশেগুঁড়ি হয়ে। প্রভাতি শাখার স্কুল ছুটি হয়েছে। মনোয়ারা খাতুন বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৯ নম্বর ফটকের সামনে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে, খালি রিকশা পেলেই গলা ছেড়ে ডাক ছাড়ছিলেন, ‘রামপুরায় যাবেন’। রাস্তার ওপর পায়ের পাতা ডোবা পানি। পাশেই মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির মাইশা রেইনকোট গায়ে। রিকশাচালকেরা কেউ আমল দিচ্ছিলেন না ডাকে।

মনোয়ারা জানালেন, সকালে ৭০ টাকায় এসেছেন রামপুরার উলন রোডের বাসা থেকে। রিকশাভাড়া স্বাভাবিক সময় ৪০ থেকে বড়জোর ৪৫ টাকা। এখন ফেরার সময় ৭০ টাকাতেও যেতে চাচ্ছে না।

 

সিদ্ধেশ্বরী রোডের মুখ থেকে মৌচাক মার্কেট হয়ে মালিবাগ মোড় পর্যন্ত পানিতে ডুবে আছে। ওদিকে মগবাজার ওয়্যারলেস গেট থেকে মালিবাগের দিকের সকড়টিও ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের কারণে খানাখন্দে ভরা। রিকশাচালকেরা ওই পথে রামপুরার দিকে যেতে চান না। ফলে এবার বৃষ্টিবাদলের দিনগুলোতে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাতায়াতে ভয়ানক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানালেন এই রামপুরাবাসী। তাঁর মতো অনেক অভিভাবককেই যানবাহনের জন্য স্কুলের সামনে এই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে গতকাল বুধবার।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল ভোররাত থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এতেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বেইলি রোড, সার্কিট হাউস রোড, শান্তিনগর মোড় থেকে মালিবাগ মোড়ে বেলা চারটার পরও ছিল জলমগ্ন। পরশু দিনের মাত্র দেড় ঘণ্টায় ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ঢাকা শহর অচল হয়ে পড়ে।

গতকাল পানি জমেছে নয়াপল্টন এলাকাতেও। গত পরশুর ভারী বৃষ্টিতে এই সড়কটি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। গতকাল নয়াপল্টনের সুপার মার্কেট গাজী ভবনের তৈরি পোশাকের দোকান মালিহা প্লেসের ব্যবস্থাপক মো. লিটন জানালেন, বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তাঁদের এই এলাকার মার্কেটগুলোতে বিক্রি কমছে। পরশু মার্কেটে তেমন লোকজন আসেনি। গতকালও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুব কম।

গতকাল কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, রাজাবাজার, ইন্দিরা রোড, ফার্মগেট—এসব এলাকায় পানি ছিল পথের কিনার দিয়ে। মহল্লার গলিগুলোর ভেতরে বিভিন্ন সংস্থা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য যেসব গর্ত খুঁড়েছিল, তা ভরাট করা হয়েছিল নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে। পরশুর ভারী বৃষ্টিতে সেসব নির্মাণসামগ্রী উঠে গিয়ে গর্তগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। কলাবাগান এলাকার বশিরউদ্দিন রোড, লাল ফকিরের গলিসহ আশপাশের গলিগুলো প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

মিরপুরের ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত পুরো এলাকা ভোর থেকেই ছিল জলমগ্ন। রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা ছিল কম। রিকশাগুলো প্রধান সড়কে না গিয়ে পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে ‘পানি পারাপার’ করছিল। ফলে অফিসযাত্রীরা বৃষ্টিতে ভিজে বাস ধরার জন্য প্রধান সড়কে আসেন। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ১০ নম্বর গোল চক্কর ও শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড রীতিমতো যাত্রীদের সমাবেশে পরিণত হয়। অনেকক্ষণ পরপর একটি বাস এলে তার দিকে যাত্রীরা জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে ছুটতে থাকেন।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে হাটখোলা অভয় দাস লেনে কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে ম্যানহোলে রিকশার চাকা পড়ে উল্টে যায়। জমে থাকা ময়লা পানিতে পড়ে কেঁদে ফেলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রুমা। তার বাবা ওয়ারীর বাসিন্দা আবদুল জব্বার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ম্যানহোলের ভেতরের ময়লা কখনো পরিষ্কার করা হয় না। অথচ পানি জমলেই ঢাকনা খুলে দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানোর ব্যবস্থা করা হয়।

ভোররাতে অঝোরধারায় যে বৃষ্টি হয়, তাতেই তলিয়ে যায় অভয় দাস লেন ও আশপাশের এলাকা। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে প্রায় ১০টা পর্যন্ত হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির পর পানি জমে যায় প্রায় হাঁটুসমান। জমে থাকা ময়লা পানি মাড়িয়ে কামরুন্নেসা স্কুল ও শহীদ নবী স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভেতরে যেতে দেখা যায়।

স্থানীয় অনন্যা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের একজন অংশীদার মো. এরশাদ বলেন, আগে ভারী বৃষ্টিতেও এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা হতো না। সময়মতো ড্রেনেজ লাইন পরিষ্কার না করায় এবার জলাবদ্ধতা বেশি হচ্ছে।

এ ছাড়া পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে পানি ছিল দুপুর পর্যন্ত। ইসলামবাগ ঈদগাহ এলাকার হানিফ হোসেন বলেন, তাঁদের এলাকায় আলীর ঘাট, ইটওয়ালা ঘাট, ক্লাব ঘাট এলাকা দুপুর পর্যন্ত জলমগ্ন ছিল। তিনি বাড়ি থেকে বের হতে পারেননি। ওয়ারীর লারমিনি স্ট্রিট, জুরাইন ও মুরাদপুর এলাকার হাইস্কুল ও মাদ্রাসা রোডে পানি ছিল বিকেল পর্যন্ত। পোকার বাজারের সামনে পানি জমে ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত।

দয়াগঞ্জ মোড় তলিয়ে যায় হাঁটুপানির নিচে। বিকেলের দিকে প্রধান সড়ক থেকে পানি নেমে গেলেও এলাকার মহল্লাগুলোর ভেতরের গলিতে পানি জমে ছিল। যানবাহনের ভাড়াও হাঁকা হয়েছে বেশি।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো