অসময়ের হঠাৎ বৃষ্টিতে জনজীবনে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। সিটি করপোরেশন, ওয়াসার নানা পরিকল্পনা ও যন্ত্র আনার গল্প নগরজীবনে উন্নতির কোনো ছাপ ফেলতে পারছে না; বরং চিরচেনা দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। বৃষ্টির পানির সাথে ড্রেনের দুর্গন্ধময় পানি একাকার হয়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি। বৃষ্টির সাথে যানজট একে অপরের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। আধা ঘণ্টা পথ অতিক্রম করতেই পার হয়ে যাচ্ছে তিন ঘণ্টা। তবে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের দাবি গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কোথাও পানি জমেনি।
এ বছর এমনিতেই পুরো বর্ষা মওসুম জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তার ওপর আশ্বিনের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করেই মওসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সোমবারের পর গতকালও সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কখনো হালকা আবার কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আর এতেই রাজধানীর চিরচেনা রূপ আবারো হাজির হয়েছে। যে সড়কেই যাওয়া যায় সেখানেই পানি জমে রয়েছে। ড্রেন তো আগেই ভর্তি ময়লা আবর্জনায়, তাই বৃষ্টির পানি যাওয়ার কোনো পথ নেই। এ কারণে এক একটি সড়কই যেন পরিণত হয়েছে বড় ড্রেনে। অলি-গলি থেকে মূল সড়ক সর্বত্রই পানি থই থই করছে। এতে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে।


সরেজমিন দেখা যায়, কাকরাইল, শান্তিনগর, বিজয়নগর থেকে ফকিরাপুল-আরামবাগ-মতিঝিল এলাকায় সড়কে হাঁটু পানি জমে। এতে যানবাহন আটকে পড়ে। সৃষ্টি হয় যানজটের। জলাবদ্ধতার কারণে অনেকগুলো সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে। অটোরিকশা পরিবর্তন করে অনেককে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে। মগবাজার, মৌচাক হয়ে মালিবাগ রেলগেট, রামপুরা ব্রিজ, মেরুল বাড্ডা, মধ্যবাড্ডা এলাকায় হাঁটু পানি জমে যায়। জমে যাওয়া পানির কারণে অটোরিকশা ও অন্য যানবাহন রাস্তায় আটকে পড়ে। মধ্যবাড্ডায় রাস্তার ওপর ময়লার ভাগাড় পানিতে মিশে সড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দেয়।
মালিবাগ থেকে রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর সড়কেও পানিতে থই থই করতে থাকে। নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর থেকে বারিধারা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এতে যানবাহন আটকে পড়ে। দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। রিকশায় বাড়তি ভাড়া দিয়ে অনেককে অফিস ও কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে। উত্তরার এয়ারপোর্ট সড়ক, জসীমউদ্দীন রোড, গুলশান-বনানী, মহাখালী ফাইওভারের নিচে, আইসিসিডিডিআরবি থেকে মহাখালী বাসস্টান্ড পর্যন্ত হাঁটু পানি জমে যায়। পানির সাথে রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা মিলে দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা।
কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকার সব সড়ক ও স্টেশনের প্রবেশমুখ হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়। পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ায় যাত্রীরা চরম বিড়ম্বনার শিকার হন। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে সদরঘাট টার্মিনাল পর্যন্ত, ঢাকা মেডিক্যালের সামনে রাস্তা, গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারের সামনে পানি জমে যায়। মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে বৃষ্টির পানি দেখা যায়। বৃষ্টির পানিতে নিউমার্কেটের নিচতলার অধিকাংশ দোকানপাট তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও হাঁটু পানি উঠে যায়। নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এ মার্কেটের বহু দোকানিকে বৃষ্টি থেকে তাদের জিনিসপত্র রার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাথের হকারদের দোকানপাটও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। সাইন্স ল্যাব থেকে নিউমার্কেট হয়ে বলাকা পর্যন্ত এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন ক্রেতা, বিক্রেতা ও যাত্রীরা। শহীদ মিনার এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন সড়কও পানিতে তলিয়ে যায়। তৌহিদুর রহমান নামে এক রিকশাযাত্রী জানান, রাস্তায় পানি থাকায় চলতে গিয়ে ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হয়। কোথায় গর্ত আছে তাও বোঝা যায় না। এজন্য অনেক সাবধানে চলতে হয়েছে। আবার অনেকে সাবধান হলেও চোরা গর্তে পড়ে রাস্তায় কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে গেছেন।
সড়কে পানি জমে যাওয়ায় গণপরিবহন, রিকশাসহ সব ধরনের যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। যানজটে পড়ে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে যাত্রীদের। রেজা করিম নামে এক যাত্রী জানান, মগবাজার থেকে ৬ নম্বর বাসে পল্টন আসতেই তার তিন ঘণ্টা লেগে গেছে।
জলাবদ্ধতা দূর করতে দুই সিটি করপোরেশন সম্প্রতি দফায় দফায় মতবিনিময় সভা করেছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা শোনা গেছে। উত্তর সিটি করপোরেশন সম্প্রতি ঘটা করে জেড অ্যান্ড সাকার মেশিন নিয়ে এসেছে। যা দিয়ে খুব দ্রুত পানি অপসারণ করা যায় বলে তাদের দাবি। কিন্তু এসব কিছুই কাজে আসছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টির পানি জমে থাকছে বিভিন্ন সড়কে। তবে এটি মানতে চান না উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হক। তার দাবি বৃষ্টি হলেও উত্তর সিটির কোথাও গতকাল পানি জমেনি। একই ধরনের অভিমত ঢাকা ওয়াসারও। ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল আলম চৌধুরী জানান, গতকাল রাজধানীর কোনো সড়কেই পানি জমেনি। পাম্পের মাধ্যমে পানি অপসারণ ছাড়াও ওয়াসার কর্মচারীরা পানি অপসারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ায় পানি জমতে পারেনি বলে তার দাবি।

 

সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত