রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, সুন্দরবনবিনাশী সব চুক্তি বাতিলসহ সাত দফা দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ডাকা আধা বেলা হরতাল চলাকালে শাহবাগে হরতাল-সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়েছে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে, জলকামান ব্যবহার করে। পুলিশের মারধরে দুই সংবাদকর্মীসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। হরতালে অন্য কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সকাল ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এই হরতাল ডেকেছিল। জাতীয় কমিটি দাবি করেছে, পুলিশের হামলায় শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ছয়জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।


শাহবাগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের প্রতিবেদক কাজী এহসান বিন দিদার ও ক্যামেরাপারসন আবদুল আলিমকে মারধরের ঘটনায় পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এরশাদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। শাহবাগে জাতীয় কমিটির কর্মী মিজানুর রহমানকে মারধর করে পুলিশ।
রাজধানীর বাইরে রাজশাহী, খুলনাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল ও সমাবেশ হয়।
হরতাল শেষে জাতীয় কমিটির নেতারা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে কাল শনিবার রাজধানীসহ সারা দেশে মিছিল ও সমাবেশ, ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীসহ সারা দেশে রাজপথে অবস্থান কর্মসূচি ও ১১ মার্চ খুলনায় উপকূলীয় জেলাগুলোর জনগণকে নিয়ে মহাসমাবেশ।
হরতাল-সমর্থকেরা সকাল ছয়টা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মিছিল-সমাবেশ করেন। তাঁরা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জড়ো হওয়া হরতাল-সমর্থকেরা মিছিল নিয়ে সকালে শাহবাগের দিকে যান। মিছিলটি জাতীয় জাদুঘরের কাছাকাছি গেলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। হরতাল-সমর্থকদের হটাতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে, কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। হরতাল-সমর্থকেরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন। কয়েক দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বেলা দেড়টার দিকে মিজানুর রহমান নামে জাতীয় কমিটির এক কর্মী জলকামানের সামনে ওঠেন। পুলিশ তাঁকে নামিয়ে মারধর করে ও টেনেহিঁচড়ে শাহবাগ থানায় নিয়ে যেতে থাকে। এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারী তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে তাঁরাও মারধরের শিকার হন। এটিএন নিউজের প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসন সেখানে গেলে তাঁদেরও মারধর করে পুলিশ। কয়েকজন পিকেটারকেও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর অন্য হরতাল-সমর্থকেরা টিএসসির দিকে সরে যান। কাঁদানে গ্যাসের কারণে ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েন।
দুই সংবাদকর্মীকে পরে ছেড়ে দেওয়া হলে তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঢাকা মেডিকেল সূত্র বলেছে, শাহবাগে আহত ১০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
শাহবাগের ঘটনায় বেশ কয়েকজন হরতাল-সমর্থক আহত হন বলে জানিয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার, ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির রয়েছেন।
পুলিশ বলেছে, শাহবাগ থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
হরতালের সমর্থনে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, পুরানা পল্টন, দৈনিক বাংলা মোড় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশ হয়।
জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, গত বুধবার রাত থেকেই হরতাল-সমর্থকদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল। হরতালের সমর্থনে সকালে শাহবাগ এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা করে পুলিশ। এতে কয়েকজন আহত হন। ভয়ভীতি ও হামলা সত্ত্বেও তাঁদের আন্দোলন চলবে।
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় শাহবাগ থানার এএসআই এরশাদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে রমনা বিভাগের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এটিএন নিউজের বার্তা সম্পাদক সারওয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ জানিয়েছেন, রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ করা এবং সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে জাতীয় কমিটির আহ্বানে ঢাকায় হরতাল চলাকালে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে জেলা কমিটি। বিকেলে নগরের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়।
জেলা শাখার আহ্বায়ক রফিউর রাব্বির সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বাসদের জেলা সমন্বয়ক নিখিল দাস, সিপিবির জেলা সংগঠক বিমল দাস, গণসংহতি আন্দোলনের জেলা আহ্বায়ক তরিকুল সুজন ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল।
খুলনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে মানববন্ধন করেছে দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়ন পরিষদ নামের একটি সংগঠন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বাবুরবাড়ির সামনে এ মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে নেতৃত্ব দেন বাগেরহাট-৪ আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সাংসদ তালুকদার আবদুল খালেক। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মানববন্ধনে অংশ নেন।