সুন্দরবনের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। বাংলাদেশ সময় বুধবার দিবাগত রাতে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) ৪৭তম বার্ষিক সভায় ‘আ নিউ চ্যাপ্টার ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন’ সেশনে দু’জনের মধ্যে এ বিতর্ক হয়।
আল গোর আলোচনার সূত্রপাত করে বলেন, ‘গত বছর বিশ্বের সব দেশের মধ্যে সোলার প্যানেল বসানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক নম্বর দেশ ছিল। সেসময় গড়ে প্রতি দুই মিনিটে একটি করে সোলার প্যানেল বসানো হয় বাংলাদেশে। তবে বর্তমানে এর মাত্রা কমে গেছে।’


এরপরই রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে আল গোর বলেন, ‘সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এবং এটি একমাত্র বন যেখানে রয়াল বেঙ্গল টাইগার পাওয়া যায়। বাংলাদেশ এখানে একটি নোংরা (ডার্টি) কয়লা প্রকল্প স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে।’ তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের মাত্রা দ্বিগুণ করার অনুরোধ করেন।
আল গোরের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি না, কেন কয়লা প্রকল্প নিয়ে মানুষ কথা বলে।’ রামপাল প্রকল্পকে সমর্থন করে তিনি বলেন, ‘এটি সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে একটি নদীর ধারে স্থাপিত হবে। এটি একটি আধুনিক সুপার-ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর কারণে পরিবেশ যাতে দূষিত না হয় তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০০ সালে ঘনবসতিপূর্ণ দিনাজপুরে আধুনিক নয় এমন একটি কয়লা প্রকল্প স্থাপন করা হয়। কিন্তু তখন কেউ এ বিষয় নিয়ে বলেননি। আমার মনে হয় যারা রামপালের বিরোধিতা করছেন তাদের মানুষের প্রতি দরদ নেই। বরং তারা সুন্দরবন ও রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সুন্দরবন ও রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক এবং এ প্রকল্প তাদের ওপর কোনও বিরুপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে না।’ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এ বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর সেশনের সঞ্চালক থমাস এল ফ্রিডম্যান আল গোরকে কিছু বলার আহ্বান জানালে তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন অব ন্যাচার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহবান জানিয়েছে যেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ অন্যান্য জীবজন্তুর কোনও ক্ষতি না হয়।’ যে নদীর ধারে রামপাল প্রকল্প স্থাপন করা হচ্ছে সেই নদীতে কয়েকটি কয়লা বোঝাই জাহাজ ডুবে গেছে বলে উল্লেখ করেন আল গোর।
এর উত্তরে শেখ হাসিনা আল গোরেকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, ‘আপনি নিজেই জায়গাটি দেখে আসুন।’
এর আগে একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদেরকে দেশের উন্নতি করতে হবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও বং বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। আমরা এখন পর্যন্ত শুধু প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনও সহায়তা পাইনি। তবে জলবায়ুবিষয়ক প্যারিস চুক্তির পরে আমরা আশাবাদী, যে প্রতিশ্রুতি আমাদের দেওয়া হয়েছে তা পূরণ হবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘উন্নত দেশগুলো নিজেদের উন্নতি করেছে। দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের দায়িত্ব তাদের ওপরও বর্তায়। আমরা সীমিত সম্পদ নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে মোকাবিলা করছি। কিন্তু ধনী দেশ কিংবা বেসরকারি খাতেরও দায়িত্ব আছে এ বিষয়ে কিছু করার।’ শেখ হাসিনা  আল গোরের মধ্যকার বিতর্কটি দেখার জন্য ক্লিক করুন