রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য রাশিয়া ফেরত নেবে না মর্মে প্রকাশিত সংবাদে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশিষ্ট নাগরিকগণ উক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিবেশ ও নিরাপত্তাজনিত সকল প্রকার ঝুঁকি নিরসনমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কোনভাবেই অগ্রসর না হবার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।

আজ এক বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ বলেন, “পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আইন ২০১৫'র ৭ (৪) অনুযায়ী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে হবে, এবং ৭ (৫) ও (৬) অনুযায়ী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উদ্ভুত সকল তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের হ্যান্ডলিং, ট্রিটমেন্ট, কন্ডিশনিং এবং ডিসপোজাল নিশ্চিত করে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী এ বর্জ্যরে সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনার দায়ভার গ্রহণ করবে চুক্তিভুক্ত রাশিয়ার কোম্পানী। অথচ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেরত নেয়ার ব্যাপারে রাশিয়া বাস্তবে রূপপুর প্রকল্পের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা বাংলাদেশের পক্ষে কোন অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, সম্ভবও নয়।”



বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীগণ বলেন, বিশে^র বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনার আলোকে অত্যন্ত জনবহুল এ দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে এবং এ সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনে অস্বচ্ছতার বিষয়ে দেশের নাগরিক সমাজ বার বার উদ্বেগ জানালেও তা অগ্রাহ্য করে সরকার রূপপুরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। কোন রকম জনমত যাচাই না করে সরকার এ প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও স্থান নির্বাচন এবং চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। স্বাক্ষরিত চুক্তি এখনো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী রাশিয়া এখন সরকারকে দৃশ্যত জিম্মি করে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে বোঝা বাংলাদেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে কারিগরী প্রস্তুতি ও দক্ষতাহীন এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য এ পরিস্থিতি অবশ্যই গভীর উদ্বেগজনক। যেখানে শুধুমাত্র তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বিবেচনায় ইতালি নিজ দেশকে তেজস্ক্রিয়তা মুক্ত রাখার স্বপক্ষে ভোট গ্রহণ করেছে; অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, গ্রীস, আয়ারল্যান্ড, লাটভিয়া, লিচেনস্টেন, লুক্সেমবার্গ, মালয়েশিয়া, মালটা, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, ফিলিপাইন এবং পর্তুগাল পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে; স্পেন, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং জার্মানির মত উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন রাষ্ট্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ সরে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে এবং যেখানে জাপান এখনো ফুকুশিমা দুর্ঘটনার রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি সেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আশির্বাদের পরিবর্তে অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পারমাণবিক বর্জ্য মজুদ রাখা এবং তা পরিশোধন করা একবারেই অসম্ভব।

বর্তমানে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমরা সরকারের কাছে পুনর্বার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সংক্রান্ত চুক্তি বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। পরিবর্তে বিশেষজ্ঞদের ও সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে টেকসই জ¦ালানী বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

খুশী কবির (সমন্বয়ক, নিজেরা করি), অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল (মানবাধিকার কর্মী), রাশেদা কে চৌধুরী (নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান), হামিদা হোসেন (মানবাধিকার কর্মী), অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ (সদস্য সচিব, তেল-গ্যাস, খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি), ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (অধ্যাপক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়), সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান (প্রধান নির্বাহী, বেলা), এম হাফিজউদ্দিন খান (সভাপতি, সুজন), সৈয়দ আবুল মকসুদ (বিশিষ্ট সাংবাদিক) এবং ইফতেখারুজ্জামান (নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি)।