বিএনপি চেয়ারপার্সণ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সুন্দবনের কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন একটি দেশবিরোধী ও গণবিরোধী সিদ্ধান্ত। জনমত উপেক্ষা করে দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী এই সিদ্ধান্ত জনগণের উপর জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দিচ্ছে এই স্বৈরাচারী সরকার। প্রকল্পটি অন্য স্থানে সরাতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জায়গারও অনেক বিকল্প আছে। কিন্তু সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। কাজেই সুন্দরবনকে নিশ্চিত ধবংসের মুখে ঠেলে দেয়ার হঠকারী, অযৌক্তিক, অলাভজনক রামপালের সকল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। একইসাথে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপার্সন। গতকাল বুধবার বিকেলে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোট আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। 

 

৩০ মিনিটের বক্তব্যে রামপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পের নানা ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। গণমাধ্যমের উদ্দেশে বলেন, এই বিষয়টা আমাদের সকলের। এটা শুধু বিএনপি, আওয়ামী লীগ অথবা অন্য কারও বিষয় নয়, এটা সারা দেশের বিষয়। আপনারা রামপালের বিষয়টি দেশবাসীর কাছে তুলে ধরুন। এটা আমার অনুরোধ।

সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, তরিকুল ইসলাম, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ২০ দলীয় জোটের নেতাদের মধ্যে বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার শফিউল আলম প্রধান, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, এলডিপির ড. রেদোয়ান আহমেদ, এনডিপির খোন্দকার গোলাম মূর্তজা, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ন্যাপ ভাসানীর আজহারুল ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবদুল করিম খান, খেলাফত মজলিশের আহমেদ আবদুল কাদের, ন্যাপের এম গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, ইসলামিক পার্টির আবুল কাশেম, মুসলিম লীগের জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, পিপলস লীগের সৈয়দ মাহবুব হোসেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ, ডিএল’র সাইফুদ্দিন মনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, দেশের উন্নয়ন ও জনজীবনের স্বাচ্ছন্দের জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে যদি দেশ এবং দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্থ হয়, জনজীবন বিপর্যস্থ হয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র ধ্বংস হয়- তাহলে সেই সিদ্ধান্ত হয় দেশ বিরোধী-গণবিরোধী। বাগেরহাট জেলার রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ঠিক তেমনি একটি দেশ বিরোধী-গণবিরোধী সিদ্ধান্ত। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট এবং মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে ৫৬৫ মেগাওয়াট ওরিয়ন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলেছে। দেশ-বিদেশের পরিবেশবিদ, সামাজিক সংগঠন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিবাদ এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের প্রকল্পের মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার দৃষ্টান্ত উপেক্ষা করে গণবিরোধী অনির্বাচিত সরকার রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের আরও একটি কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে জমি ভরাটের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছে। তিনি বলেন, জনমত উপেক্ষা করে দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত জনগণের উপর জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দিচ্ছে এই স্বৈরাচারী সরকার। সুন্দরবনের এতো কাছে স্থাপিত কয়লা-বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনিবার্য, অশুভ ও মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়ার সব প্রমাণ উপস্থাপনের পরেও সরকার তার অবস্থান পরিবর্তনে শুধু অস্বীকৃতি জানাচ্ছে না- বরং আরও দ্রুত এই গণবিরোধী- দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগী হয়েছে। তিনি বলেন, এর দ্বারা আবারো প্রমাণিত হলো যে, এই সরকার স্বৈরাচারী বলেই জনমত কিংবা দেশের স্বার্থের পরোয়া করে না। যে প্রকল্প দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক বেষ্টনী ধ্বংস করবে, জীব- বৈচিত্রের বিলোপ ঘটাবে, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকা ধ্বংসের কারণ হবে, পরিবেশ ও পানি দূষিত করবে, আশে পাশের কৃষি জমির উর্বরা শক্তি এবং মৎস সম্পদ ধ্বংস করবে এবং সর্বোপরি যে প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক- তা বাস্তবায়নে সরকারের যুক্তিহীন জেদ ও দ্রুততা শুধু সন্দেহজনক নয়, দেশবাসীর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। যে সুন্দরবন লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করছে, যে সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবন এই দেশকে আইলা, সিডর, ঘূর্ণিঝড় থেকে বাঁচার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিচ্ছে, ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত সেই আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য সুন্দরবনকে নিশ্চিত ধ্বংসের শিকার করার চক্রান্ত সফল হতে দেয়া যায় না- দেয়া উচিত নয়। দেশের অস্তিত্ব ও স্বার্থের বিনিময়ে ব্যক্তি কিম্বা গোষ্ঠীর মুনাফা এবং অনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের অপচেষ্টা রোধ করা তাই সময়ের দাবি।

সাবেক তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, রামপাল কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কর্তৃপক্ষ, রামসার কনবেনশনের সচিবালয়-এমন কি বাংলাদেশের বন অধিদফতরের আপত্তি অগ্রাহ্য করে সরকার এই প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় জনগণের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ উপেক্ষা করে, তাদেরকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দিয়ে প্রায় ৮ হাজার পরিবারকে জোর করে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ফসলী জমি ও মাছের ঘের ভরাট করা হয়েছে। এই উচ্ছেদকৃত কৃষিজীবীদের সাথে সুন্দরবনে কাঠ, গোলপাতা, মধু সংগ্রহ করে এবং এর আশ-পাশের নদী ও খালে মাছ শিকার করে যে হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতো তারাও বেকার ও নিঃস্ব হয়ে যাবে। উল্লেখযোগ্য যে, ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন নামের যে প্রতিষ্ঠানটির সাথে যৌথভাবে রামপাল কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে- সেই একই প্রতিষ্ঠান ভারতের মধ্য প্রদেশের নরসিংহপুর জেলায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের যে প্রস্তাব দিয়েছিল, ভারত সরকার তা বাতিল করে দিয়েছে। নরসিংহপুর প্রকল্পটি ১০০০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব ছিল- অথচ রামপালে এই একই আকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য দেয়া হয়েছে ১৮৩৪ একর জমি।

তিনি বলেন, নরসিংহপুরের প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে প্রধানত: ৩টি কারণে- (ক) জন বসতিপূর্ণ এলাকায় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, (খ) কৃষি জমির ওপর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না এবং (গ) নর্মদা নদী থেকে ঘন্টায় ৩২ কিউসেক পানি নেয়া যাবে না। এর সাথে রামপালের তুলনা করলে যা দেখা যায় - তা’হলো - (ক) নরসিংহপুর জেলার আয়তন ৫,১২৫.৫৫ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যার ঘণত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১৮৭ জন। অন্যদিকে বাগের হাট জেলার আয়তন ৩,৯৫৯.১১ বর্গ কিলোমিটার আর রামপালের আয়তন ৩৩৫.৪৬ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব ৩৮২ জন- অর্থাৎ নরসিংহপুরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। (খ) নরসিংহপুরের জমি দোফসলী কিন্তু রামপালের জমি তিন ফসলী। ঘেরগুলোতে মাছ চাষ হয় সারা বছর। (গ) নর্মদা নদী থেকে ঘন্টায় ৩২ কিউসেক পানি নিতে দেয়া যাবে না বলে মধ্যপ্রদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমতি দেয়া হয়নি। অথচ নর্মদার চেয়েও ছোট পশুর নদী থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রতি ঘন্টায় ১৪৪ কিউসেক পানি নেয়া হবে এবং তা লবনাক্ততামুক্ত করার জন্য আলাদা প্লান্ট বসানো হবে। আর যদি গভীর নলকূপ বসিয়ে মিষ্টি পানি তুলতে হয় তা হলে ২ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন ৭২টি গভীর নলকূপ বসাতে হবে। একটি নলকূপের ১ হাজার ফুটের মধ্যে আরেকটি নলকূপ বসানো যায় না। অর্থাৎ, এক বিস্তৃত এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি শুকিয়ে এক মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। 

খালেদা জিয়া বলেন, ভারতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে আইনী বাধা আছে। অথচ সে দেশেরই একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাদের নিজের দেশে যা করতে পারে না শুধুমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থে তা বাংলাদেশে করছে। আর জনগণের প্রতি দায়িত্বহীন এবং দেশের স্বার্থের প্রতি উদাসীন বাংলাদেশ সরকার তার অনুমতি দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, ২০০৮ সালে ভারতের কর্নাটক রাজ্যের রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের ২০ কিলোমিটার দূরে ১ হাজার মেগাওয়াট কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ভারত সরকার বাতিল করতে বাধ্য হয়। ঐ ন্যাশনাল পার্কের আকার সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের এক দশমাংশ মাত্র। বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ায় ভারত সরকার তামিলনাড়ু রাজ্যের একটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব বাতিল করেছে ২০১২ সালে। অন্যদিকে ভারতের সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট এর এক গবেষণায় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব প্রাপ্ত এন টি পি সি নামের প্রতিষ্ঠানটিকে ভারতের সব চেয়ে দূষণকারী প্রতিষ্ঠান বলে চিহ্নিত করেছে।

রামপালের ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সুন্দরবনের এত কাছে পশুর নদীর তীরে রামপাল কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবে এবং তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে সুদূর প্রসারী। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য বলে ঘোষিত সুন্দরবন, এই বনের বিরল প্রজাতির পশু-পাখি, বনের ভিতর ও পাশ দিয়ে বলে চলা নদী ও খালের মৎসসম্পদ এবং বিপুল বনজ সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার যে আশংকা বিজ্ঞানীরা করছেন- তার প্রমাণ অসংখ্য। আমেরিকার টেক্সাসে ফায়েত্তি কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে ৩০ হাজার টন সালফারডাই অক্সাইড নির্গত হতো। এর ফলে টেক্সসের হাইওয়ে ২১’এর ৪৮ কিলোমিটার জুড়ে গাছপালা ধ্বংস হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানি নির্গমন হলে তাতে বিভিন্ন মাত্রার দূষণকারী উপাদান থাকে। সে কারণে পৃথিবীর সব দেশে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ‘শূণ্য নির্গমন’ নীতি অবলম্বন করা হয়। কিন্তু এন টি পি সি রামপালে এই নীতি অনুসরণ না করেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে। অথচ এই এন টি পি সিই যখন ভারতে ছত্তিশগড়ে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল তখন ‘শূণ্য নির্গমন’ নীতি মানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ‘শূণ্য নির্গমন’ নীতি অনুসরণ না করার ফলে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতি ঘন্টায় নির্গত ৫১৫০ ঘনমিটার পানি পশুর নদীর জলজ পরিবেশের তাপমাত্রা, পানি নির্গমনের গতি, পানিতে দ্রবীভূত নানান উপাদান বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তন করবে, যা পুরো সুন্দরবন এলাকার পরিবেশের উপর ধ্বংসকারী প্রভাব সৃষ্টি করবে। 

খালেদা জিয়া বলেন, ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৩২০ মেগাওয়াটের এই প্রকল্পে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পোড়ানো হবে। সরকারী প্রতিবেদন অনুযায়ী সুপার ক্রিটিক্যাল পদ্ধতি ব্যবহার করার পরেও ৭৯ লাখ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। যত উচু চিমনিই ব্যবহার করা হোক, বাতাসের চেয়ে ভারী এই মারাত্মক গ্যাস এদেশেই এবং সুন্দরবনের উপরেই ফিরে আসবে। এছাড়াও প্রতিদিন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড এবং ৮৫ টান নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়ে সুন্দরবনের বাতাসের ঘনত্ব বাড়িয়ে গোটা সুন্দরবন ও তার আশপাশের অঞ্চলকে ধ্বংস করবে। ১৯৯৭ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সুন্দরবনের মত পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকায় বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হতে পারবেনা। অথচ ইআইএ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত এসব গ্যাসের ঘনত্ব নবেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৪ মাইক্রোগ্রাম হবে। এই অগ্রহণযোগ্য মাত্রাকে বৈধতা দেয়ার জন্য সরকার সুন্দরবনকে আবাসিক ও গ্রাম এলাকা দেখিয়ে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। একই ধরনের প্রতারণা করা হয়েছে ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনি দিয়ে নির্গত গ্যাসীয় বর্জ্যরে ১২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা স্থানীয় এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি করবেনা বলে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবচেয়ে ক্ষতিকর বর্জ্য হবে দুই ধরণের কয়লা পোড়া ছাই। এখানে প্রতি বছর ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পোড়ানোর ফলে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাস ও ২ লাখ টন বটম অ্যাস বর্জ্য তৈরী হবে। এই ফ্লাই অ্যাস, বটম অ্যাস এবং তরল ঘণীভূত ছাই বিপদজনক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে। কারণ এতে পারদ, সীসা, নিকেল, আর্সেনিক, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, রেডিয়াম ইত্যাদির মত বিভিন্ন ক্ষতিকর ও তেজ:স্ক্রিয় ভারী ধাতু মিশে থাকে। ই.আই.এ প্রতিবেদনে উৎপাদিত ছাই ইএসপি সিস্টেমের মাধ্যমে চিমনির মধ্যেই ধরে রাখার কথা বলা হলেও-কিছু উড়ন্ত ছাই বাতাসে মিশবে বলে স্বীকার করা হয়েছে। এই কিছুর পরিমাণ ১ শতাংশ হলেও বছরে ৭ হাজার ৫০০ টন ফ্লাই অ্যাস আশেপাশের এলাকাসহ সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে তেজ:স্ক্রিয় দুষণ ঘটাবে এবং নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসের রোগ সৃষ্টি করবে। এই প্রকল্পের কঠিন বর্জ্যরে একটি অংশ দিয়ে ১৪১৪ একর ¯’ানীয় নীচু জমি ভরাট করার যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তা পরিবেশের জন্য আরও মারাত্মক হবে। এসব বর্জ্য বাতাসে উড়ে আশ-পাশের এলাকা এবং পানিতে ভিজে ভূগর্ভস্থ পানির সাথে মিশে নদীর পানি বিষাক্ত ও তেজঃক্রীয় করবে।

২০ দলের শীর্ষ নেতা বলেন, হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে রামপাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পরিবহন করার সময় জাহাজ থেকে কয়লার গুড়া, ভাঙ্গা বা টুকরা কয়লা, তেল, ময়লা-আবর্জনা, জাহাজের দুষিত পানিসহ বিপুল পরিমান বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদী, খাল, মাটিসহ গোটা সুন্দরবন দুষিত করবে। বারবার এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে কয়লা স্থানান্তরের সময় কয়লার গুড়া ও ভাঙ্গা কয়লা পানিতে বা মাটিতে পড়ে কিংবা বাতাসে মিশে পরিবেশ দূষণ করবে। এছাড়াও কয়লা পরিবহনকারী জাহাজের ঢেউ পশুর নদীর দুই তীরের ভূমি ক্ষয় করবে, কয়লা স্থানান্তরের যন্ত্রপাতি শব্দদূষণ ঘটাবে এবং রাতের বেলায় জাহাজের সার্চ লাইটের আলো নিশাচর প্রাণীসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পশুপাখির জীবনচক্রে মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলবে। এর ফলে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের পশু-পাখীর সংখ্যা অনিবার্য্য ভাবেই কমে যাবে। 

খালেদা জিয়া বলেন, সারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ধ্বংসকারী এবং জনবহুল বাংলাদেশের বিপুল এলাকার পরিবেশ বিষাক্তকারী রামপাল কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ঋণ প্রদানকারী ভারতের এক্সিম ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৪৯টি সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন যৌথ স্বাক্ষরে প্রেরিত এক পত্রে এই প্রকল্পে ঋণ প্রদান না করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, একই ধরনের আহ্বানের প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের ৩টি বিখ্যাত ব্যাংক এবং নরওয়ের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ২টি ‘পেনশন ফান্ড’ এই প্রকল্পে ঋণ প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রতিদিনই বিশ্বের কোথাও না কোথাও কোন না কোন মানবতাবাদী ও পরিবেশবাদী সংগঠন এই জনস্বার্থ ও পরিবেশ বিপন্নকারী প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বাংলাদেশেও সচেতন জনগণ এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু সরকার শুধু অনমনিয় নয়, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনকে দমন করে চলেছে।

বেগম জিয়া বলেন, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আরেকটি বড় অগ্রহণযোগ্য দিক হচ্ছে-এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য অলাভজনক। এই প্রকল্পের ১৫% অর্থ জোগান দেবে বাংলাদেশ পিডিবি, ১৫% ভারতীয় কোম্পানী ঘঞচঈ এবং বাকি ৭০% ব্যাংক ঋণ নেয়া হবে। কোম্পানী বন্ধ হলে কিংবা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে পুরো ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ পিডিবি কিনবে - আর যে নীট লাভ হবে তা ৫০% হারে পিডিবি ও এন টি পি সির মধ্যে ভাগ হবে। কিন্তু ১০০% পরিবেশ ধ্বংস হবে শুধুই বাংলাদেশের। ১৫% বিনিয়োগ করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ৫০% মুনাফা নেবে এবং ট্যাক্স ফ্রি সুবিধার আওতায় মুনাফার পুরো টাকা তাদের দেশে নিয়ে যাবে। অন্য দিকে কয়লার ক্রয় মূল্যকে বিদ্যুতের দাম নির্দ্ধারনের ভিত্তি হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই সরকারী পর্যায়ে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য টন প্রতি ১৪৫ ডলার মূল্যে কয়লা আমদানীর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ায় পিডিবি কে ৮.৮৫ টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অথচ পিডিবি’র সাথে দেশীয় অরিয়ন গ্রুপের যে চুক্তি হয়েছে তাতে এই কোম্পানীর মাওয়ায় প্রতিষ্ঠিতব্য কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট ৪টাকা মূল্যে এবং খুলনার লবনচরা ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রতিষ্ঠিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৩টাকা ৮০ পয়সা মূল্যে বিদ্যুৎ কেনা হবে। দ্বিগুণেরও বেশি মূল্যে রামপাল থেকে বিদ্যুৎ কিনে পিডিবিকে অবশ্যই ভর্তুকি দিয়ে জনগণের কাছে বিক্রি করতে হবে বলে পিডিবি’র লভ্যাংশ শেষ পর্যন্ত লোকসানে পরিণত হবে। পরিবেশ বিবেচনায় না নিলেও জেনে শুনে এমন একটি লোকসানী প্রকল্পে সরকার কি উদ্দ্যেশে এবং কার স্বার্থে জড়ালো - এটাই জনগণের প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোন সন্তোষজনক জবাব নেই বলেই সরকার এই প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের পুলিশ দিয়ে লাঠি পেটা করছে।

খালেদা জিয়া বলেন, দ্রুত শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জনগণের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সময়ের দাবি। এই দাবি পূরণে উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নেয়া যে কোন সরকারের কর্তব্য। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য জনস্বার্থ কিংবা জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার কোন সুযোগ নেই - অধিকারও নেই কোন সরকারের। বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের জন্য বিকল্প বিদ্যুৎ ও বিকল্প জ্বালানির সন্ধান করা উচিত। ছোট গ্যাস জেনারেটর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি বিদ্যুৎ, টাইডাল বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস প্রকল্প, সোলার এনার্জি ইত্যাদি বিষয়ের দিকে আমাদের মনোযোগী হওয়া দরকার। অর্থাৎ সুন্দরবনের মত প্রাকৃতিক বর্ম ধ্বংস করে দেশকে প্রাকৃতিক দূর্যোগে অরক্ষিত না করে প্রকৃতিবান্ধব ও সাশ্রয়ী উপায়ে জ্বালানির প্রয়োজন মেটানোর উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। প্রিয় দেশবাসীকে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, এমনিতেই উজানে আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রত্যাহার এবং বাঁধ নির্মাণের ফলে পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের মত আমাদের বড় বড় নদীগুলোতে পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এসব নদী ও তার শাখা নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার ফলে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ব্যাপক মরুকরণ শুরু হয়েছে; আবহাওয়া পাল্টে গেছে। এসব নদী এখন আর উজান থেকে প্রবাহিত বৃষ্টির পানিও ধরে রাখতে পারেনা। ফলে নদীগুলোর পাশ্ববর্তী অঞ্চলে পুণঃপুণঃ বন্যায় লাখো মানুষ এবং রাস্তা-ঘাট ও ফসলাদির বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। এর উপর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া বিষাক্ত হলে এবং প্রাকৃতিক বর্ম সুন্দরবন ধ্বংস হলে- আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আর বাসযোগ্য থাকবেনা। বাংলাদেশের কোন নাগরিকই এটা মানতে পারে না- মানবে না। গোটা বিশ্ব যখন আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের অনিবার্য্য বিপদ নিয়ে গভীর উদ্বিঘ্ন - তখন জেনে শুনে এই দেশ এবং তার কোটি কোটি অধিবাসীকে নিশ্চিত বিপদের দিকে ঠেলে দেয়ার যে কোনো অপচেষ্টার প্রতিবাদ করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের স্থানেরও অনেক বিকল্প আছে - কিন্তু সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। কাজেই সুন্দরবনকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার হঠকারী, অযৌক্তিক ও অলাভজনক রামপালের সকল কয়লা-বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। আমি এই দাবির পক্ষে সোচ্চার হওয়ার জন্য ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।