চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে-বিপক্ষের লোকজন ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিতে দুই ভাইসহ চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১১ পুলিশসহ অন্তত ১৯ জন। গতকাল সোমবার বিকেলে ইউনিয়নের হাদিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পাল্টাপাল্টি সমাবেশকে ঘিরে সংঘর্ষে প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন গণ্ডামারা ইউনিয়নের চরপাড়ার দুই ভাই মরতুজা আলী (৫৫) ও মো. আনোয়ারুল ইসলাম (৪৪), একই ইউনিয়নের রহমানিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা এলাকার বাসিন্দা জাকের আহমদ (৬০)। এ ছাড়া রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নেওয়ার পথে মো. জাকের হোসেন নামের আরেকজন মারা যান।


আহত ১৯ জনকে প্রথমে বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত সাতজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) মো. হাবিবুর রহমান গতকাল রাত নয়টায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে গ্রামবাসী পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পলিশ ঘটনাস্থলে গেলে পুলিশের গাড়িবহর আটকে দেয় বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধীপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। এ সময় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ব্যাপক গুলিবিনময় হয়। এ ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী পক্ষের লোকজন পুলিশের গাড়িবহরে গুলি ছুড়লে বাঁশখালী থানার পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ১১ জন গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে একজন আনসার সদস্যের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহত তিনজনের লাশ রাতে থানায় আনা হয়। এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুর রশীদকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটির সদস্য কতজনের হবে তা আহ্বায়ক ঠিক করবেন। এই কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার বিষয়ে প্রতিবেদন দেবে।
গতকাল রাতে গণ্ডামারা ইউনিয়নে নিহত মরতুজা আলী ও আনোয়ারুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই ভাইকে হারিয়ে পরিবারে মাতম চলছে। দুজনের বড় ভাই বদি আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাইয়েরা লবণমাঠে কাজ করতেন।
বাঁশখালীর গণ্ডামারার পশ্চিম বড়ঘোনায় দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল স্থানীয়দের একটি পক্ষ। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য এসএস পাওয়ার লিমিটেড ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে চুক্তি হওয়ার পর তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে পরিবেশ বিপর্যয় হবে এবং পৈতৃক বসতভিটা হারাবেন অনেকে—এমন শঙ্কা থেকে বসতভিটা রক্ষা সংগ্রাম কমিটির ব্যানারে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজের ভাগ নিয়েও গ্রামবাসীর মধ্যে দুটি পক্ষ তৈরি হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, গত রোববার গণ্ডামারায় বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের একটি গাড়িতে হামলা করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিবাদ জানায় স্থানীয়দের একটি পক্ষ। এ ঘটনায় বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। পুলিশ হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করে। এর প্রতিবাদে সোমবার (গতকাল) বেলা তিনটায় মধ্যম গণ্ডামারা হাদিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকে বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী পক্ষ। অপর দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষের লোকজন পাল্টা সমাবেশ ডাকে। পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমাবেশস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করেন। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী পক্ষের লোকজন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সমাবেশ করে। এ নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী বসতভিটা ও গোরস্থান রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক লিয়াকত আলী প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, গত রোববার রাতে পুলিশ এলাকার নিরীহ লোকজনকে ধরে নিয়ে যায়। এর প্রতিবাদে হাদিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সমাবেশ ডাকা হয়েছিল। সমাবেশ শেষ হওয়ার পরে পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহত আনসার উদ্দিনের বাবা সৈয়দ নুর বলেন, ‘সমাবেশে অংশ নেওয়ার জন্য আমরা যাচ্ছিলাম। ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার কথা শুনিনি। সমাবেশস্থলে যাওয়ার পরপরই পুলিশ অতর্কিতে আমাদের ওপর গুলি ছুড়তে শুরু করলে যে যার মতো পালিয়ে যাই।’
তবে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুজ্জামান বলেন, দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকায় আইনশৃঙ্ক্ষলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় সমাবেশস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুই পক্ষই সমাবেশ করার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়।
এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেড ও চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে ২৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হচ্ছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ ভবনে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য গণ্ডামারা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমি কেনা হয়েছে। এই প্রকল্পের ৭০ শতাংশের মালিকানা থাকবে এস আলম গ্রুপের ছয়টি প্রতিষ্ঠানের। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশের মধ্যে সেপকো ২০ শতাংশ এবং চীনের অপর প্রতিষ্ঠান এইচটিজি ১০ শতাংশের মালিক হবে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর কেন্দ্রটিতে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো