প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আলোচনা, তর্কবিতর্ক ও দর-কষাকষির শেষে গতকাল শনিবার জলবায়ু চুক্তিতে সম্মত হলো বিশ্ব। ফ্রান্সের প্যারিসে চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় সম্মতি দেয় ১৯৫টি দেশ।
খসড়ায় স্বল্পোন্নত ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর দাবির সঙ্গে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর দাবির ভারসাম্য রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চুক্তিটি প্যারিসেই স্বাক্ষরিত হচ্ছে না। আগামী বছর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিবের এক বিশেষ সভা ডেকে সেখানে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা তাতে স্বাক্ষর করবেন।প্যারিস চুক্তিটি আইনি বাধ্যবাধকতাসহ হবে কি না, তা নিয়ে জলবায়ু বিপন্ন দেশ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে দুশ্চিন্তা ছিল। তাদের সেই চিন্তার অবসান করে আইনি বাধ্যবাধকতাসহ চুক্তির খসড়াই অনুমোদন হয়েছে।

নাসার সাবেক বিজ্ঞানী জেমস হ্যানসেন প্যারিসের জলবায়ু-সংক্রান্ত আলোচনাকে ‘জোচ্চুরি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গতকাল হ্যানসেন বলেন, ‘এটা নিশ্চিতভাবেই একটি প্রবঞ্চনা। এটা বলা একটা ফাজলামি ছাড়া আর কিছুই না যে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি আমরা সীমাবদ্ধ রাখব। আর প্রতি পাঁচ বছর পরপর পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা করব। এসব কথা একেবারে অর্থহীন। পরিস্থিতির উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা নেই। আছে শুধু প্রতিশ্রুতি।’
কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের পরিচালক বিজর্ন লুমবুর্গ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্যারিস চুক্তিতে নানা ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, এই চুক্তিতে জলবায়ু অর্থায়নের জন্য ১০ হাজার কোটি ডলারের যে তহবিলের কথা হয়েছে, তা খুবই কম। কেননা এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রির নিচে রাখতে হলে প্রতিবছর রাষ্ট্রগুলোকে এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে।’
তবে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন প্যারিস চুক্তিকে মানবজাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এই চুক্তির পথ ধরেই মানবজাতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ থেকে রক্ষা করা হবে। তবে আমাদের এই পথে আরও অনেক দূর এগোতে হবে।’
এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি ডলার এবং ২০১৬ থেকে ২০২০-এর মধ্যে মোট ১০ হাজার কোটি ডলার দেওয়ার যে অঙ্গীকার শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো কানকুন সম্মেলনে করেছিল, তা থেকেও তারা পিছিয়ে এসেছে। চুক্তিতে অর্থায়ন কে করবে, কীভাবে হবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের বেশির ভাগ পরিবেশবাদী সংগঠন ও সংস্থা প্যারিস চুক্তিকে মন্দের ভালো হিসেবে দেখছে। চুক্তিতে এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রির বেশ খানিকটা নিচে রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের সব কটি শিল্পোন্নত দেশসহ ১৯০টি দেশ কার্বন নিঃসরণের স্বতঃপ্রণোদিত অঙ্গীকার বা আইএনডিসিকে চুক্তির অংশ হিসেবে অনুমোদন করেছে।
তবে প্যারিস চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন করায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বিশ্বনেতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘এই প্রথম বিশ্বের সব রাষ্ট্রের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি চুক্তি হলো। আমাদের আগামী দিনের কাজ হবে এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা।’
চুক্তিতে এই শতাব্দীর শেষে বিশ্বের তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার যে চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে এই দাবিটি পাঁচ বছর ধরে করা হচ্ছিল। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-১৫-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম এই দাবিটি তাঁর বক্তৃতায় তুলে ধরেন। পরে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দাবিটি তুলে ধরা হয়। প্যারিস সম্মেলনে বিশ্বের ১২৬টি রাষ্ট্র এই দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়।
প্যারিস চুক্তি সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এলডিসি গ্রুপের উপদেষ্টা সালিমুল হক বলেন, চুক্তিতে সবকিছু থাকলেও তা দুর্বলভাবে আছে। অর্থায়নের বিষয়টি থাকলেও তার উৎসের বিষয়টি পরিষ্কার নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য লস অ্যান্ড ড্যামেজ বিষয়ে আলাদা অধ্যায় রাখা হয়েছে। তবে এতে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের দায়দায়িত্বের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।
এদিকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে, আগামী ২২ এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিলের মধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব একটি সভা ডেকে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য বিশ্বের সব রাষ্ট্রপ্রধানকে আহ্বান জানাবেন। সেখানেই প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
প্যারিসের লো বুর্জে গত ৩০ নভেম্বর শুরু হয় এই সম্মেলন। এতে যোগ দেন ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ থেকে যায় ৩৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল। প্রথম দিন বক্তব্য দেন অন্তত ৫০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা।
খসড়া প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর: বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, জলবায়ু সম্মেলনের চূড়ান্ত খসড়া প্রত্যাখ্যান করেছেন সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) সদস্যরা। তাঁরা ঐতিহাসিক দায়িত্ব, দূষণের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং সাধারণ কিন্তু ভিন্নতর দায়িত্ববোধের মতো বিষয়গুলোকে খসড়া চুক্তির পথনির্দেশক নীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। লো বুর্জে গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন তাঁরা। এতে উপস্থিত ছিলেন ইকুইটিবিডির রেজাউল করিম চৌধুরী, সিএসআরএলের জিয়াউল হক, সিসিডিএফ/বিসিএএসের গোলাম রাব্বানি, সিডিপির জাহাঙ্গীর হাসান মাসুম প্রমুখ।

 

 

সূত্র: প্রথম আলো